অর্থবছর কোন দেশে কখন থেকে কখন
- বদলে গেছে বাংলাদেশের অর্থবছর, আগে ছিল জুলাই-জুন, এখন হলো এপ্রিল-মার্চ

প্রতীকী ছবি
বদলে গেছে বাংলাদেশে অর্থবছর। এতদিন দেশের অর্থবছর ছিল ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। এবার তা পাল্টে করা হলো ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ।
গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে হয়েছে এই সিদ্ধান্ত। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সাধারণত জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে থাকে বর্ষাকাল। এ সময় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলে। এতে একদিকে যেমন দীর্ঘায়িত হয় কাজ, তেমনি কাজের গুণগত মানও হয় ক্ষতিগ্রস্ত। জনদুর্ভোগের বিষয়টি তো রয়েছেই।
এপ্রিল–মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করলে
বর্ষার আগেই শেষ করা যাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ। ফলে কাজের সময় ও মান ভালো হবে,
কমবে জনদুর্ভোগ, এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থবছর পরিবর্তনের এই আলোচনা থেকেই উঠেছে নতুন এক প্রশ্ন। বিশ্বের সব দেশেই কি অর্থবছর জুলাই থেকে জুন? নাকি প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন অর্থবছরও রয়েছে কোনো কোনো দেশে?
বেশিরভাগ দেশেই অর্থবছর শুরু হয় ১ জানুয়ারি থেকে, শেষ হয় ৩১ ডিসেম্বর। তবে দেশের জলবায়ু, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, কর আদায়ের সময় কিংবা ঐতিহাসিক কারণ বিবেচনায় ভিন্ন সময়ের অর্থবছর ব্যবহারের নজিরও রয়েছে। চলুন জেনে নেই এমনই কিছু দেশের ভিন্ন অর্থবছরের সময়সীমা নিয়ে।
ভারত
ভারতের অর্থবছর শুরু হয় ১ এপ্রিল এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৩১ মার্চ। মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬৭ সালে ইংল্যান্ডের অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই এ অর্থবছর চালু করা হয়েছিল ভারতে। পাশাপাশি হিন্দু পঞ্জিকা ও ফসলের মৌসুমের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় তা আর পাল্টানো হয়নি।
পাকিস্তান
পাকিস্তানের অর্থবছর চলে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত। ব্রিটিশ শাসনামলের শুরুতে এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, বিশ শতকে পাকিস্তানসহ বেশ কিছু অঞ্চলে জুলাই-জুন সময়ের অর্থবছর চালু ছিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে হিসাবের সুবিধায় একই অর্থবছর চালু রাখে পাকিস্তান।
শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কায় অর্থবছর হিসাব করা হয় ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে মিলিয়ে। অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে ধরা হয় এক অর্থবছর। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এবং প্রতি বছরের হিসাবের বের করার সুবিধায় পুরো বছরকেই অর্থবছর হিসেবে চালু রেখেছে দেশটি।
নেপাল
নেপালে অর্থবছর শুরু হয় জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে, শেষ হয় পরের বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে। মূলত স্থানীয় বর্ষপঞ্জির হিসাব অনুযায়ী নেপালে অর্থবছর ধরা হয়। দেশটির কৃষি ও ধর্মীয় উৎসবকে প্রাধান্য দিয়ে এভাবে ঠিক করা হয়েছে অর্থবছর।
ভুটান
ভুটানে অর্থবছর চলে ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত। দেশটির বাজেট প্রণয়ন ও সরকারি ব্যয়ের পরিকল্পনাও এই বার্ষিক চক্রকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। মূলত দক্ষিণ এশিয়া ও কমনওয়েলথের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাল মেলাতেই এ সময়কালকে নির্ধারণ করা হয়েছে অর্থবছর হিসেবে।
মালদ্বীপ
মালদ্বীপেও অর্থবছরের হিসাব ধরা হয় ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে মিলিয়ে। অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে ধরা হয় অর্থবছর হিসেবে। দেশটির পর্যটন খাতের কথা মাথায় রেখে এভাবে ঠিক করা হয়েছে অর্থবছর।
আফগানিস্তান
আফগানিস্তানের অর্থবছর ঠিক করা হয়েছে সৌর বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। সাধারণত এর সময়সীমা ২১ মার্চ থেকে পরের বছরের ২০ মার্চ পর্যন্ত।
যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের অর্থবছর শুরু হয় ১ অক্টোবর এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর। অতীতে ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিল রেখে ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হতো দেশটির অর্থবছর। তবে গ্রীষ্মকালের কারণে সে সময় বাজেট করা ছিল খানিকটা চ্যালেঞ্জিং। পরে ১৯৭৪ সালে বাজেটের সুবিধার্থে তা পাল্টে ফেলা হয়। এতে নতুন অর্থবছর শুরুর আগে বাজেট ও বরাদ্দসংক্রান্ত কাজ শেষ করার জন্য কয়েক মাস সময় পায় কংগ্রেস।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের অর্থবছর চলে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। তবে যুক্তরাজ্যের করবর্ষ আলাদা। ব্যক্তিগত আয়করের করবর্ষ শুরু হয় ৬ এপ্রিল এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৫ এপ্রিল। ফলে দেশটির ‘অর্থবছর’ ও ‘করবর্ষ’ এক নয়।
অতীতে করবর্ষ শুরু হতো ২৫ মার্চ, যা ‘লেডি ডে’ নামে পরিচিত ছিল। ১৭৫২ সালে ব্রিটেনে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে পরিবর্তনের সময় ১১ দিন বাদ দেওয়া হয়। এরপর করবর্ষের তারিখও ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়।
ফ্রান্স
ফ্রান্সে সরকারি বাজেটের অর্থবছর ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে এক আর্থিক বছর হিসেবে ধরা হয়।
জার্মানি
জার্মানিতেও কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের বছর ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি নথিতে ২০২৬ সালের ফেডারেল বাজেটকে ‘হাউজহাল্টসইয়ার ২০২৬’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
কানাডা
কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থবছর শুরু হয় ১ এপ্রিল এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৩১ মার্চ। দেশটির সরকারি ব্যয় ও হিসাবের বার্ষিক চক্র অনুসরণ করে এই সময়সীমা।
অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়ায় অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই এবং শেষ হয় পরবর্তী বছরের ৩০ জুন। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক প্রতিবেদন ও বাজেট নথিতেও জুলাই-জুন সময়সীমা অনুসরণ করা হয়।
মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়ায় সরকারি আর্থিক হিসাব ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই দেশটির বাজেট ও আর্থিক নথিতে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে আর্থিক বছর হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সৌদি আরব
সৌদি আরবেও সরকারি বাজেটের অর্থবছর ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বৈশ্বিক ব্যবসা-বাণিজ্যের নানাবিধ সুবিধার কারণে ঠিক করা হয়েছে অর্থবছরের এ সময়সীমা।
অর্থাৎ জুলাই-জুন সময়সীমা বিশ্বের একমাত্র ব্যবস্থা নয়, আবার জানুয়ারি-ডিসেম্বরও সর্বজনীন নয়। ফ্রান্স, জার্মানি, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবের মতো দেশে চালু রয়েছে জানুয়ারি-ডিসেম্বরভিত্তিক অর্থবছর। এদিকে ভারতে এপ্রিল-মার্চ, যুক্তরাষ্ট্রে অক্টোবর-সেপ্টেম্বর, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানে জুলাই-জুনের মতো ভিন্ন অর্থবছরের সময়সীমাও আছে বহু দেশে।
অর্থবছর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো একক আন্তর্জাতিক নিয়ম নেই। প্রতিটি দেশ নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো, করব্যবস্থা, বাজেট প্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নির্ধারণ করে এ সময়সীমা।







