জেডসিএর প্রতিবেদন
জাপানের এলএনজি বাণিজ্যে ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

জাপানের একটি বন্দরে একটি এলএনজি ট্যাংকার। ছবি: রয়টার্স
জাপানের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। এটি দেশটিকে বৈশ্বিক অস্থির জ্বালানি বাণিজ্যের দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিতে ফেলছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ)।
সংস্থাটির নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি কিনে তা বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোয় পুনরায় বিক্রি করছে জাপান। গত ৫ বছরে দেশটি এভাবে যে পরিমাণ এলএনজি বিক্রি করেছে তা এক বছরে ১৭টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্বন নিঃসরণের সমান। আজ মঙ্গলবার লন্ডন থেকে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
জেডসিএ বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১৬.৫ বিলিয়ন কেজি মার্কিন এলএনজি ৯টি এশীয় দেশে পুনরায় বিক্রি করেছে জাপান। এসব দেশের মধ্যে আছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে (যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস উত্তোলন ও তরলীকরণ থেকে শুরু করে পরিবহন, পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার পর্যন্ত) এই জ্বালানি থেকে আনুমানিক ৬৩.৫ বিলিয়ন কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয়েছে।
বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে— এমন সময়েই এই বিশ্লেষণ সামনে এলো। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জাপান এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি ব্যবসায়ী দেশ। ২০২১ সাল থেকে দেশটি নিজ দেশের চাহিদার তুলনায় বেশি মার্কিন এলএনজি বিদেশে বিক্রি করছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জাপান নিজ ব্যবহারের তুলনায় ৭৭ শতাংশ বেশি এলএনজি পুনরায় বিক্রি করেছে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন প্রবণতা এশিয়াজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াতে পারে— যখন একই সঙ্গে নির্গমন কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চাপও রয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, ‘জাপান জ্বালানি সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশে এলএনজি সম্প্রসারণের বড় একটি চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।’
‘সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় চাপে পড়ে। তখন জাপানসহ উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ জাপান থেকে শুল্কমুক্তভাবে এলএনজি আমদানি করতে সম্মত হয়েছে। একই সঙ্গে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে’, যোগ করেন তিনি।
তিনি সতর্ক করে বলছেন, ‘এ ধরনের উদ্যোগ মূলত এলএনজি অবকাঠামোতেই বেশি গুরুত্ব দেবে। এতে বাংলাদেশের এলএনজির ওপর নির্ভরতা ও ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।’
প্রতিবেদনটি এমন সময় এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে এলএনজির দাম বেড়েছে এবং এশিয়াজুড়ে তৈরি হয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
এলএনজির প্রধান উপাদান মিথেন, যা স্বল্প সময়ের মধ্যে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এলএনজির মোট নির্গমনের প্রায় ৩০ শতাংশ আসে মিথেন লিকেজ থেকে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের ২০২৬ সালের গ্লোবাল মিথেন ট্র্যাকার প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে মিথেন নির্গমন এখনও প্রায় রেকর্ড পর্যায়ে। তবে মিথেন কমানো দ্রুত জলবায়ু ও জ্বালানি নিরাপত্তা— দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল দিতে পারে।
জেডসিএ-এর এশিয়া অঞ্চলের গবেষক ইউ সান চিন বলছেন, এশিয়া এখন জাপানের অতিরিক্ত এলএনজির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্রহণ করছে। এই এলএনজি পুনরায় বিক্রির পুরো জীবনচক্রের নির্গমন দেখায়, এটি এমন একটি অঞ্চলের জন্য বড় ঝুঁকি, যা ইতোমধ্যেই চরম আবহাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ।’
‘গ্যাসকে ট্রানজিশন ফুয়েল হিসেবে বাড়ানোর বদলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়া এশিয়ার জন্য বেশি নিরাপদ ও টেকসই পথ।’
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এশিয়া অঞ্চলের প্রধান এলএনজি গবেষক স্যাম রেনল্ডসের ভাষ্য, ‘জাপানি কোম্পানিগুলো দেশীয় চাহিদা কমে যাওয়ায় বিদেশে নতুন ক্রেতা খুঁজছে। এই কৌশল উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যয়বহুল ও অস্থির জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল করে ফেলতে পারে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরকে বিলম্বিত করতে পারে।’
প্রতিবেদনটি বলছে, এশিয়াজুড়ে এলএনজি অবকাঠামোর সম্প্রসারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করতে পারে— যা জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমা। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য এই গবেষণা আবারও প্রশ্ন তুলছে— স্বল্পমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে।




