ছেঁড়া নোটের ‘জোড়ায়’ চলছে না সংসার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষের কাছ থেকে কম দামে ছেঁড়া-ফাটা-ময়লা বা ত্রুটিযুক্ত নোট সংগ্রহ করেন মো. মিজানুর রহমান। পরে সেই নোট বাংলাদেশ ব্যাংকে বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন বা প্রচলনযোগ্য নোট নিয়ে মুনাফা অর্জন ও জীবিকা নির্বাহ করেন। লাভের আশায় পর্যায়ক্রমে তিনি ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার পুরনো নোট জমা দেন বাংলাদেশ ব্যাংক খুলনা শাখায়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নোট গ্রহণ করে লাগিয়ে দেয় ‘বিক্রীত’ সিলমোহর। পরে বিনিময়মূল্য না দিয়ে সে নোটই ফেরত দিয়েছে তাকে। এখন সিলমোহরযুক্ত নোটগুলো নিচ্ছে না অন্য কোনো ব্যাংক।
শুধুই মো. মিজানুর রহমানই নন, বাংলাদেশ ব্যাংক খুলনা শাখার সামনে ফুটপাতে ছেঁড়া-ফাটা নোট কেনাবেচা করেন অন্তত ৩২ জন। তারাও বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের খুলনা শাখায় অন্তত ২৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন।
তবে তাদের অভিযোগ, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পুরনো নোট জমা নিয়ে তাতে ‘বিক্রীত’ সিল দিলেও বিনিময়মূল্য না দিয়ে আগের একই নোট ফেরত দিয়েছে। বিক্রীত সিলমোহরযুক্ত এসব নোট নিচ্ছে না অন্য কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকও। ফলে পুঁজি আটকে গিয়ে ২০ জন ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। বাকি ১২ ব্যবসায়ীর ব্যবসাও চলছে নামমাত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংক খুলনা শাখা সূত্রে জানা গেছে, দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা রয়েছে ১০টি। এসব শাখাকে প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ছেঁড়া-ফাটা-ময়লা বা ত্রুটিযুক্ত নোট গ্রহণ ও বিনিময় কার্যক্রম বিরত থাকতে। নির্দেশনা অনুযায়ী, গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে শাখাগুলো এ ধরনের নোট নেওয়া বন্ধ রেখেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে চরম বিপাকে পড়েছেন খুলনার ছেঁড়া নোট বিনিময়কারী ও সাধারণ গ্রাহকরা।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান রাজু জানিয়েছেন, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ৩ লাখ টাকার ছেঁড়া-ফাটা-ময়লা বা ত্রুটিযুক্ত জমা দিয়েছেন। টাকাগুলোয় সিল মেরে কর্মকর্তারা বলেছিলেন, যাচাই শেষে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট বিনিময়মূল্য। কিন্তু বিনিময় না করে ফেরত দেওয়া হয়েছে একই নোট। ফেরত দেওয়া টাকায় বিক্রীত সিল মারা। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকও দিচ্ছে না সমাধান। অন্য ব্যাংকও নিচ্ছে না সিল মারা টাকা। ফলে পুঁজি সংকটে অচল হয়ে পড়েছে ব্যবসা।
ইলিয়াস মুন্সী নামে আরেক ব্যবসায়ী জানালেন, হাট-বাজার ও বিভিন্ন এলাকা থেকে পুরনো নোট সংগ্রহ করে কয়েক দফায় ৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। বিনিময়মূল্য না পেয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনিও।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা টাকা দ্রুত ফেরত বা বিনিময়ের ব্যবস্থা করা না হলে তারা আরও বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। তাই সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান তাদের।
পুরনো টাকা বিনিময় করেন আজগর আলী। তার ভাষায়, মূলধনের সব টাকা দিয়ে কিনেছিলাম ছেঁড়া-ফাটা নোট। সেই টাকা এখন আটকে গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। পুঁজি হারিয়ে হয়ে গেছি নিঃস্ব। আয়-রোজগার বন্ধ।
শুধু ব্যবসায়ী নন, ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে সাধারণ গ্রাহকরাও পড়েছেন ভোগান্তিতে। ডুমুরিয়া উপজেলা থেকে ছেঁড়া নোট বিনিময় করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের খুলনা শাখায় আসেন তরুণ পাল ও সন্দীপন বিশ্বাস। তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নোট বদলানো যেত। ব্যাংকে এখন সেই কাউন্টারই বন্ধ। সময় ও অর্থ ব্যয় করে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে খালি হাতে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের খুলনার শাখার যুগ্ম পরিচালক মুনতাসির মামুন বলেছেন, ‘কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার আগেই এসব নোট নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন নির্দেশনা আসায় বিনিময়মূল্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে চিঠি।’ দ্রুতই একটি সমাধান পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
গ্রাহকদের উদ্দেশে এই যুগ্ম পরিচালক জানিয়েছেন, তফসিলি ব্যাংকের উদ্দেশে প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক ত্রুটিযুক্ত নোট গ্রহণ বন্ধ করলেও ব্যাংকগুলোকে এসব নোটের মাধ্যমে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বিনিময়মূল্য পরিশোধের।






