সাক্ষাৎকার
বিকল্প পথ খুঁজছেন রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা

ইমরান হাসান
নানাবিধ সংকটে জর্জরিত দেশের রেস্তোরাঁ খাত। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে ধুঁকছে। প্রশাসনিক জটিলতা, উচ্চ ভ্যাট-ট্যাক্স আর নানা অব্যবস্থাপনার বেড়াজালে পিষ্ট হচ্ছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা। এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অর্থনৈতিক প্রতিবেদক ওবায়দুর রহমান
প্রশ্ন: বর্তমান রেস্তোরাঁ ব্যবসার সামগ্রিক চিত্রটা কেমন? কোন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এ খাত?
ইমরান হাসান: শুধু রেস্তোরাঁ নয়, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক টানাপড়েন এবং দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামগ্রিক ব্যবসার পরিবেশই শোচনীয়। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রেস্তোরাঁ খাত। দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, পরিবহন ও কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিপরীতে মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। সাধারণ মানুষ খাবারের খরচ কমিয়ে দিয়েছে, রেস্তোরাঁয় যাওয়ার অভ্যাসও কমেছে। ফলে আমাদের বিক্রি ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও আস্থার সংকটের কারণে স্বস্তিদায়ক পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রশ্ন: অতিরিক্ত ভ্যাট-ট্যাক্স ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অভিযান নিয়ে আপনাদের দীর্ঘদিনের দাবি রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা কী দেখছেন?
ইমরান হাসান: সরকারি হিসাবে দেশে প্রায় ৬০ হাজার, আর বেসরকারি হিসাবে প্রায় পাঁচ লাখ রেস্তোরাঁ রয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মরত প্রায় ৩০ লাখ মানুষ। এত বড় একটি শিল্পের জন্য কার্যকর নীতিসহায়তা নেই। উল্টো ১২-১৩টি সরকারি সংস্থার লাইসেন্স ও বিধিবিধানের জটিলতায় পড়তে হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স ব্যবস্থাপনার জটিলতায় সরকারের রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে, ব্যবসায়ীরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
বেইলি রোডের মর্মান্তিক ঘটনার পর সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ছাড়াই ঢালাওভাবে রেস্তোরাঁ বন্ধ ও ভাঙচুর করা হয়েছে। নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার প্রশিক্ষণ-নির্দেশনার চেয়ে শাস্তির প্রবণতাই বেশি। আমরা সব সংস্থাকে এক ছাতার নিচে এনে একক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনো সরকারই অংশীজনদের সঙ্গে বসে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেনি।
প্রশ্ন: অনলাইন ফুড ডেলিভারি সেবা কি ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে?
ইমরান হাসান: গ্রাহকদের সুবিধা হলেও ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই উচ্চহারে কমিশন নিচ্ছে। অন্যদিকে কিছু ক্লাউড কিচেন স্বাস্থ্যবিধি ও ভ্যাট-ট্যাক্সের নিয়ম না মেনে কম দামে খাবার বিক্রি করছে। এতে মূল ধারার রেস্তোরাঁগুলো অসম প্রতিযোগিতায় পড়ছে। নিজেদের খরচ সামলাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে টিকে থাকা কঠিন।
প্রশ্ন: সংকটের কারণে কর্মসংস্থান ও রেস্তোরাঁ বন্ধের চিত্র কেমন?
ইমরান হাসান: অনেক স্বনামধন্য রেস্তোরাঁ ও ব্র্যান্ড ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। অনেকে কর্মী অর্ধেকে নামিয়েছে, কেউ বন্ধ করেছে প্রতিষ্ঠান। আমার নিজের প্রতিষ্ঠানেও একসময় প্রায় ৮০০ কর্মী ছিল, এখন সংখ্যা অর্ধেকের নিচে। পুরো খাতে লক্ষাধিক শ্রমিক বেকার হয়েছেন। অযৌক্তিক ভ্যাট-ট্যাক্স ও আইনি হয়রানির কারণে নতুন বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ হারাচ্ছেন।
প্রশ্ন: এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আপনাদের প্রস্তাব কী?
ইমরান হাসান: আমাদের চারটি প্রস্তাব রয়েছে। প্রথমত, সব লাইসেন্স ও অনাপত্তিপত্র (এনওসি) এক ছাতার নিচে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যৌক্তিক ভ্যাট-ট্যাক্স নির্ধারণ করতে হবে, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজে পরিশোধ করতে পারেন এবং সরকারও রাজস্ব পায়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের ফায়ার সেফটি ও হাইজিন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, এফবিসিসিআই ও রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সমন্বয়ে স্থায়ী টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। রাষ্ট্র ব্যবসায়ীদের শত্রু নয়, অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করলে এ খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। অন্যথায় বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়বে।



