৪৯ কোটির বন্দর এখন গোচারণ ভূমি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শত মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা, সেই প্রতিষ্ঠান এখন সুনসান। অর্ধশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো পড়ে আছে অবহেলায়। ঘাস খাচ্ছে গরু-ছাগল, ঝোপঝাড়ে ঢেকে যাচ্ছে ভবন ও সড়ক। বলা হচ্ছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা স্থলবন্দরের কথা। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হলেও চালু হয়নি এর কার্যক্রম। ফলে বিপুল বিনিয়োগের সুফল মিলছে না। উল্টো বেতন, নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ মাসে ব্যয় হচ্ছে ২-৩ লাখ টাকা।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাকসুড়ায় প্রয়োজনীয় সড়ক ও শুল্ক স্টেশন গড়ে না ওঠায় বন্দরের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। ফলে পুরনো পদ্ধতিতে খোয়াই নদীপথে ও মাথায় করে পণ্য নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, চুনারুঘাট সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে কেদারাকোট গ্রামে সাত একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা বাল্লা স্থলবন্দরে মানুষের আনাগোনা নেই। নান্দনিক ভবন, সড়ক ও ইয়ার্ড নিয়ে এলাকাটি দেখতে শহরের মতো হলেও অব্যবহৃত প্রাঙ্গণে গবাদি পশু চরছে। বন্দরের ভেতরে অফিস, ডরমিটরি, সীমানা প্রাচীরসহ অবকাঠামো রয়েছে। তবে ব্যবহার ও জনবলের অভাবে স্থাপনাগুলো ঝোপঝাড়ে ঢাকছে। নষ্ট হচ্ছে সরঞ্জাম। ভেতরে এখনো চার-পাঁচটি পরিবার ও একটি মুদিদোকান রয়েছে।
দোকান মালিক রোকেয়া জানালেন, জমি অধিগ্রহণের টাকা এখনো পরিশোধ না করায় তারা পৈতৃক ভিটা ছাড়েননি।
বন্দর এলাকার নিরাপত্তায় রয়েছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আরডিটিএল। নিরাপত্তাকর্মী জালাল জানালেন, এখানে পালাক্রমে মোট পাঁচজন রক্ষী দায়িত্ব পালন করেন। মাঝেমধ্যে দর্শনার্থী এলেও বাকি সময় এলাকাটি নীরব।
২০১৬ সালের ২৩ মার্চ বাল্লা শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হয়। ২০১৭ সালের ১ জুলাই একনেক সভায় এর উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন পায়। অবকাঠামো নির্মাণে ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ইয়ার্ড, ওয়েট স্কেল, অফিস ভবন, ডরমিটরি ও সীমানা প্রাচীরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালের জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শেষ হয়। তবে কাজ শেষ হওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বন্দরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি অবকাঠামো অব্যবহৃত পড়ে আছে। এতে কর্মসংস্থান, বাণিজ্য প্রসার ও আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।
বন্দর চালু না হওয়ার প্রধান বাধা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়মুড়া এলাকায় অবকাঠামোর ঘাটতি। সীমান্তের প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে আসাম-আগরতলা মহাসড়ক থাকলেও পাহাড়মুড়ায় যাওয়ার উপযোগী সড়ক গড়ে ওঠেনি। সেখানে শুধু সরু ইটা পথের রাস্তা রয়েছে।
সরেজমিন সীমান্তের ওপারে ভারতের কাঁটাতারের পাশে একটি পাকা দেয়াল ও টিনের চালার ঘর দেখা যায়। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, এটিই ওপারের শুল্ক স্টেশনের স্থাপনা। বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ওপারে ছোট পরিসরে শুল্ক স্টেশন হলেও সড়ক নির্মাণ বাকি। ফলে পণ্য পরিবহনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আর এই কারণ দেখিয়ে ২০২৫ সালের অক্টোবরে অন্তর্বর্তী সরকার বন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করে।
বাল্লা সুপারিনটেনডেন্ট সবুজ চন্দ্র রায় বললেন, সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালে বন্দরের কাজ স্থগিত করা হয়। এটি চালু থাকলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা সুগম হতো। বছরে ভারত থেকে ১০-১৫ কোটি টাকা ও বাংলাদেশ থেকে ৪-৫ কোটি টাকা আয় হতো বলে ধারণা করা হয়।
তিনি জানালেন, ভারতের অংশে ছোট পরিসরে শুল্ক স্টেশন হলেও সড়ক নির্মাণ এখনো বাকি। বন্দর চালুর বিষয়টি এখন পুরোপুরি দুই দেশের সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।



