রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ১০ বছরে বাস্তুহারা ২৫ হাজার পরিবার

সংগৃহীত ছবি
একটি বসতভিটা শুধু চার দেয়াল নয়, সেখানে থাকে মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। বসতভিটা হারিয়ে কোনোভাবে মাথাগোঁজার ঠাঁই মিললেও সে আশ্রয়টুকু নিয়ে চিন্তিত রংপুরের তিস্তাপাড়ের হাজারো পরিবার। নদীভাঙন, কালবৈশাখী কিংবা ঝোড়ো বাতাস— যেকোনো একটির আঘাতে আবারও হারিয়ে যেতে পারে শেষ আশ্রয়টুকু। গত ১০ বছরে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বাস্তুহারা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার পরিবার। এ সময় চরম অনিশ্চয়তায় তিস্তা তীরবর্তী গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার পরিবার।
এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল সোমবার (৫ অক্টোবর) পালন করা হয় বিশ্ব বসতি দিবস। ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ প্রতিপাদ্যে নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাসনের কথা বলা হয়েছে দিন জুড়ে। অথচ রংপুরের তিস্তাপাড়ে হাজারো পরিবারের কাছে নিরাপদ একটি ঘর এখনো অধরা স্বপ্ন। নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে বিভিন্ন চর ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নেওয়া এসব মানুষকে প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে নতুন করে ঘর হারানোর আতঙ্কে। জানা গেছে, নদীভাঙন, অভাব-অনটন ও পারিবারিক নানা সংকটে সহায়-সম্বল হারিয়ে বাস্তুহারা হয়েছে গঙ্গাচড়ার পরিবারগুলো। এর মধ্যে নোহালী, কোলকোন্দ, গঙ্গাচড়া সদর, লক্ষ্মীটারী, গজঘণ্টা ও মর্ণেয়া ইউনিয়নের তিস্তার চরগুলোতে অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছে প্রায় ১৫ হাজার পরিবার। মর্ণেয়া থেকে নোহালী পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার তিস্তা প্রতিরক্ষা ডান তীর বাঁধে ঝুপড়ি তুলে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১০ হাজার পরিবার।
নিঃস্ব এসব পরিবারের জন্য সরকারিভাবে আশ্রয়ণকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক কেন্দ্র। আশ্রয় হারিয়ে পরিবারগুলো আবারও হয়ে পড়ছে ঠিকানাবিহীন। প্রতি বছর কালবৈশাখীও বাঁধ-চরে আশ্রিত এসব পরিবারের ঘরবাড়ির জন্য নতুন আতঙ্ক হয়ে আসে। ঝড়ের আঘাতে শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে অনেক পরিবারকে আবারও নতুন করে গড়তে হয় ঘর। সরেজমিনে দেখা গেছে, গৃহহীন পরিবারগুলো ক্রমেই তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট বস্তি গড়ে তুলেছে। এসব বসতির চাপে হুমকির মুখে পড়েছে বাঁধও। পানি উন্নয়ন বোর্ড কয়েকবার উচ্ছেদের নোটিস দিলেও বাস্তবতা বিবেচনায় কার্যকর করতে পারেনি তা।
বাঁধ ও চরে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশের ঘর খড়, বাঁশ ও পুরনো টিন দিয়ে তৈরি। অনেক ঝুপড়ির নেই শক্ত খুঁটি, নেই মজবুত বেড়া। ফলে কালবৈশাখীর মৌসুম এলেই ঘর হারানোর শঙ্কায় দিন কাটে তাদের।
মর্ণেয়া ইউনিয়নের ছোট রুপাই আশ্রয়ণকেন্দ্রের বাসিন্দা ছিলেন নবিউল্লাহ, মহুবর, ছালেহা ও ফুলবিবি। নদীভাঙনে আশ্রয়কেন্দ্রটি বিলীন হয়ে যাওয়ায় বদলে গেছে তাদের ঠিকানাও। এখন আলাল চরে কোনোমতে ঝুপড়ি তুলে বসবাস করছেন তারা। চারবার নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছেন আলাল চরের মেহের উদ্দিন, আব্দুল মাজেদ ও মশিয়ার রহমান। নিঃস্ব হয়ে এক চর থেকে আরেক চরে ঘুরে বেড়ানো এ মানুষগুলোর এখন স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই।
তিস্তা প্রতিরক্ষা বাঁধের ধামুর এলাকায় একই আতঙ্কে দিন কাটে আশ্রিত সোনা মিয়া ও শহরবানুরের। ঝড় এলেই ঘর হারানোর ভয় জেঁকে বসে তাদের মনে। একজন বলছিলেন, ‘যখন ঝড় আইসে, বুকটা ধড়ফড় করে। শেষ আশ্রয়টুকু উড়ে গেইলে হামার কপালোত কী হইবে!’ গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তারের ভাষ্য, নদীভাঙন ও কালবৈশাখীতে প্রতি বছরই এখানকার নতুন নতুন পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। তাৎক্ষণিকভাবে তালিকা করে সরকারের উদ্যোগে তাদের ঘরবাড়ি করে দেওয়া হয়।
রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া জানালেন, নদীভাঙনের পাশাপাশি কালবৈশাখীর মৌসুমে বিশেষ করে চরাঞ্চল ও তিস্তা বাঁধে আশ্রিত পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটায়। নগরীর অনেক বস্তিতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। প্রতি বছর কালবৈশাখীতে প্রায় ১০ হাজার পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি। পরে সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয় তাদের।



