নেই প্রচার-স্বীকৃতি, তবুও লাশ কাঁধে ছুটে চলেন হাসেম মিয়া

হাসেম মিয়া, ছবি: আগামীর সময়
একটি ফোন এলেই শুরু হয় ছুটে চলা। গন্তব্য কখনও সড়ক দুর্ঘটনার স্থান, কখনও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল, আবার কখনও অজ্ঞাত পরিচয়ের কোনো মরদেহ পড়ে থাকার খবর। পচাগলা লাশ হোক কিংবা আগুনে পোড়া দেহ—ভয়াবহতার মাত্রা যতই হোক না কেন, আলামত অক্ষত রেখে মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পৌঁছে দেওয়াই তার দায়িত্ব।
বলছিলাম ঢাকার কেরানীগঞ্জের হাসেম মিয়ার কথা। পুলিশের একটি ফোন পেলেই তিনি ছুটে যান ঘটনাস্থলে। বছরের পর বছর ধরে তিনি এমন একটি দায়িত্ব পালন করে আসছেন, যা রাষ্ট্রের বিচারিক ও আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সরকারি কোনো খাতায় নেই তার নাম, নেই কোনো ভাতা, সম্মানী কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
হত্যা, আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা কিংবা অজ্ঞাত মরদেহ—সব ক্ষেত্রেই পুলিশের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন হাসেম মিয়া। ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোই শুধু নয়, কোনো মরদেহের পরিচয় শনাক্ত না হলে অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফনের ব্যবস্থাও করতে হয় তাকে।
হাসেম মিয়া জানান, জীবিকার তাগিদেই অনেক বছর আগে এ পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি তার দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ভাষ্য, অনেকে লাশের কাছে যেতেও ভয় পান। কিন্তু পুলিশ ডাকলে আমাকে যেতেই হয়। অনেক সময় গভীর রাতেও বের হতে হয়। দুর্গন্ধযুক্ত বা পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করতে হয়। কাজটা কঠিন, কিন্তু মানুষের শেষ যাত্রার দায়িত্ব বলে আমি এটাকে গুরুত্ব দিই।
তবে দায়িত্ব পালনের পথে নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মরদেহ পরিবহনের জন্য নিজস্ব কোনো ভ্যান বা যানবাহন নেই। ফলে অনেক সময় মরদেহ দ্রুত মর্গে পাঠাতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি তদন্ত কার্যক্রমেও বিলম্বের আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয়দের মতে, পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ কাজে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করলেও হাসেম মিয়া কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পান না। অথচ তার মতো মানুষদের কাজ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
হাসেম মিয়ার প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। তিনি চান একটি লাশ বহনের ভ্যান এবং ন্যূনতম সরকারি সহায়তা। তার বিশ্বাস, এসব সুবিধা পেলে আরও দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের আড়ালে থাকা এমন অনেক নীরব কর্মীর মতোই হাসেম মিয়াও কাজ করে যাচ্ছেন নিভৃতে।
মানবিক এই মানুষটির জন্য একটি লাশবাহী ভ্যান কিংবা সামান্য সরকারি সহায়তা হয়তো খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু সেটিই হতে পারে তার দীর্ঘদিনের নীরব সেবার প্রতি রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র অথচ অর্থবহ স্বীকৃতি।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওমর ফারুক জানালেন, হাসেম মিয়ার মতো মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নীরবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দুর্ঘটনা, হত্যাকাণ্ড বা অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের মতো স্পর্শকাতর কাজে তার ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।
তার কাজের পরিধি ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে কী ধরনের সহযোগিতা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, মরদেহ পরিবহনের জন্য একটি ভ্যানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। মানবিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন কাজে যারা দীর্ঘদিন ধরে অবদান রাখছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। সরকারি বিধিবিধানের আওতায় কোনো সহায়তার সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করা হবে।
রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ নীরবে করে যাওয়া মানুষদের অবদান প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন সবসময় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে আগ্রহী, যোগ করেন তিনি।




