চামড়া বেচে খরচ তুলতে হিমশিম ব্যবসায়ীরা

ছবি: আগামীর সময়
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চামড়ার বাজার যশোরের রাজারহাটে এবার চামড়ার দাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, বাজারে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে পাইকারি ক্রেতাদের দাবি, ভালো মানের চামড়া কেনা হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামেই।
যশোরের রাজারহাটে যশোরসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার চামড়া কেনাবেচা হয়। কোটি কোটি টাকার লেনদেন হওয়া এ বাজারে এবার দ্বিতীয় হাটে চামড়ার সরবরাহ আগের বছরের চেয়েও কম ছিল।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, মান ও আকারভেদে গরুর চামড়া ২০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতি পিস ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। ফলে চামড়া সংগ্রহ, লবণ প্রয়োগ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় মেটাতে অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
পিরোজপুর থেকে ১১৫টি চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেন জানিয়েছেন, বাজারে মানভেদে ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যাচ্ছে। বাইরের ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দাম কমে যাওয়ার একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন।
বিকাশ দাস ১৩৬টি ছাগলের চামড়া নিয়ে হাটে এসেছিলেন। তার ভাষ্য, গড়ে প্রতি পিস ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতে হয়েছে চামড়া। বাড়িতে আরও গরুর চামড়া রয়েছে, তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে পরবর্তী হাটে সেগুলো আনা হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
বাবুরাম দাস জানিয়েছেন, গ্রাম থেকে প্রতি গরুর চামড়া ৪০০ টাকা দরে কিনেছেন। প্রতিটিতে প্রায় ১০০ টাকা লবণের খরচ হয়েছে। অথচ বাজারে এসে মানভেদে ৩০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। ফলে পরিবহন ব্যয় ও শ্রমের মূল্য হিসাব করলে লোকসানই হচ্ছে।
ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেছেন, ২০০টি চামড়া নিয়ে এসেছিলেন তিনি। সবচেয়ে ভালো ছাগলের চামড়াটি ৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, অন্যগুলো ৭০ টাকার আশপাশে বিক্রি করতে হয়েছে। তার কাছে আরও ৩০০টি গরুর চামড়া রয়েছে, যা পরবর্তী হাটে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নন পাইকারি ক্রেতারা। তাদের দাবি, ভালো মানের চামড়া সরকার নির্ধারিত মূল্যেই কেনা হচ্ছে। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী অভিজ্ঞতার অভাবে কাটা, ছেঁড়া কিংবা রোগাক্রান্ত নিম্নমানের চামড়া কিনে ফেলছেন, যার কারণে লোকসানের মুখে পড়ছেন।
৪২ বছরের অভিজ্ঞ চামড়া ব্যবসায়ী মাহমুদ হাসান পান্নু জানিয়েছেন, গ্রামের অনেক ব্যবসায়ী ভালো চামড়া কিনলেও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে পারেন না। ফলে চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যায়। তার ভাষ্য, বাজারে ভালো মানের গরুর চামড়া ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অভিজ্ঞতার অভাবই অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ীর ক্ষতির অন্যতম কারণ।
পাইকারি ক্রেতা জাকিন হোসেন জানিয়েছেন, বাজারে ভালো ও খারাপ দুই ধরনের চামড়াই এসেছে। তিনি নিজেও একটি চামড়া ১ হাজার টাকায় কিনেছেন। ফুটপ্রতি হিসাব করলে অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দাম দেওয়া হয়েছে।
তার মতে, আরও ভালো মানের চামড়া পরবর্তী হাটে আসবে এবং তখন বিক্রেতারা ভালো দাম পাবেন।
আড়তদার আব্দুর মালেক বলেছেন, অনেক ব্যবসায়ী বাজার পরিস্থিতি যাচাই করতে সীমিত পরিমাণ চামড়া নিয়ে এসেছেন। আগামী শনিবারের হাটে সরবরাহ বাড়তে পারে।
তিনি জানান, কম দামে বিক্রি হওয়া অনেক চামড়া অ্যানথ্রাক্সসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। এসব চামড়া না বুঝে কেনার কারণেও ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এছাড়া লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় সংরক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে।
হাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ জানিয়েছেন, চামড়ার আমদানি এবার কিছুটা কম হয়েছে। সংগ্রহ, লবণ প্রয়োগ ও সংরক্ষণের প্রক্রিয়ায় কয়েকদিন সময় লাগে বলে অনেক ব্যবসায়ী এখনও চামড়ার গাট খোলেননি।
তার ধারণা, আগামী হাটে চামড়ার সরবরাহ বাড়বে এবং বাইরের ক্রেতারাও আসবেন। তখন বাজার আরও জমে উঠবে।







