রেল যোগাযোগের হাব হতে পারে জামালপুর, নেই কার্যকর উদ্যোগ

ছবি: আগামীর সময়
ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক রেল নেটওয়ার্ক এবং বিদ্যমান অবকাঠামোগত সুবিধার কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে জামালপুর জেলা।
রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ এবং উত্তরাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে জামালপুর হতে পারে একটি কৌশলগত রেল হাব। তবে দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর সরকারি উদ্যোগ, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে সেই সম্ভাবনা বাস্তব রূপ পাচ্ছে না।
রেলপথের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলেই জামালপুর অঞ্চলের রেল যোগাযোগের গুরুত্ব অনুধাবন করা হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে ময়মনসিংহের সঙ্গে ঢাকার রেল সংযোগ স্থাপনের পর ১৮৯৪ সালে রেলপথ সম্প্রসারিত হয় জামালপুর পর্যন্ত। পরে ১৮৯৯ সালে সরিষাবাড়ীর জগন্নাথগঞ্জ ঘাট এবং ১৯১২ সালে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করা হয়। ফলে জামালপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন স্টেশনে পরিণত হয়।
এক সময় দেশের উত্তরাঞ্চলে রেল যোগাযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার ছিল জামালপুর। যমুনা নদীর দুই তীরে অবস্থিত জগন্নাথগঞ্জ বাজার ঘাট, বাহাদুরাবাদ ঘাট, তিস্তামুখ ঘাট এবং সিরাজগঞ্জ ঘাটকে কেন্দ্র করে রেলওয়ের নিজস্ব ফেরির মাধ্যমে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন করা হতো। পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে রেল যোগাযোগে এই রুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
কিন্তু ১৯৯৮ সালে যমুনা বহুমুখী সেতু চালু হওয়ার পর রেল ফেরি ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে গুরুত্ব হারাতে থাকে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট ও বাহাদুরাবাদ ঘাট কেন্দ্রিক রেল অবকাঠামো। ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ে এক সময়ের ব্যস্ততম রেলপথগুলো।
রেল বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, জামালপুরের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে জামালপুরকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে আরও কার্যকর রেল সংযোগ গড়ে তোলা সম্ভব। বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ বৃদ্ধিতে জামালপুর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় তারাকান্দি-ভূঁয়াপুর-যমুনা সেতু পূর্ব লিংক রেলপথ। ২০১২ সালের ৩০ জুন উদ্বোধন হওয়া ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন হিসেবে দেখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গে জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার মানুষের সরাসরি রেল যোগাযোগ সহজ করা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর শিডিউল এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। যমুনা সেতু পূর্ব স্টেশনের ইয়ার্ড রিমডেলিং প্রকল্পের কারণে ভুঁয়াপুর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। সংশ্লিষ্ট কাজ শেষ হলেও এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি লিংক রেলপথটি। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন উভয় ক্ষেত্রেই ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমানে জামালপুর রুটে ঢাকা থেকে পাঁচটি আন্তঃনগর ও দুটি মেইল ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে দেওয়ানগঞ্জ, তারাকান্দি ও ভূঁয়াপুরগামী ট্রেন রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকেও একটি আন্তঃনগর ট্রেন এই রুটে চলাচল করে। কিন্তু ট্রেন পরিচালনায় শিডিউল জটিলতা, ঘনঘন বিলম্ব এবং পুরোনো কোচ ব্যবহারের কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমছে না। বিশেষ করে জামালপুর এক্সপ্রেস, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ও যমুনা এক্সপ্রেসের সময়সূচি নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নিয়মিত দেরিতে চলাচল, ঘনঘন বিরতি এবং নিম্নমানের লোকোমোটিভ ব্যবহারের কারণে এসব ট্রেনে যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ে ঢাকা থেকে ছেড়ে গেলেও জামালপুর পৌঁছাতে প্রায়ই দেড় থেকে দুই ঘণ্টা বিলম্ব হয়। আরও বড় সমস্যা দেখা দেয় ফিরতি যাত্রায়। ঢাকাগামী ট্রেনগুলো প্রায়ই গভীর রাতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়। ফলে যাত্রীদের মাঝরাতে গন্তব্যে ফিরতে হয়। এতে যেমন ভোগান্তি বাড়ছে, তেমনি ছিনতাইসহ নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখেও পড়তে হচ্ছে অনেককে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীদের দাবি, জামালপুরকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক রেল যোগাযোগ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে দেশের উত্তরাঞ্চল, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল এবং রাজধানীর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন, আঞ্চলিক অর্থনীতি ও শিল্পায়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তাদের মতে, প্রয়োজন শুধু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তা না হলে একসময় দেশের রেল যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জামালপুরের সম্ভাবনা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
এ নিয়ে জামালপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেছেন, ‘এই অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ট্রেন। যাত্রীদের সেবার মান বৃদ্ধিতে জয়দেবপুর-বাহাদুরাবাদ ঘাট এবং যমুনার পূর্বপাড় পর্যন্ত ডাবল লাইন খুবই দরকার। এতে রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামের সাথে উত্তরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে। সেই সাথে বাহাদুরাবাদ ঘাট-বালাসী ঘাটে দ্বিতীয় যমুনা রেল সেতু নির্মান হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক, আত্ম-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। জামালপুর হচ্ছে ট্রেন যোগাযোগের ট্রানজিট পয়েন্ট। এ অঞ্চলের গুরুত্ব বুঝেই বৃটিশরা রেললাইনের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই লাইন এখন শুধু ডাবল লাইনে রূপান্তর করলেই যাত্রীর সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। তিনি দ্রুত ডাবল লাইন, আন্তঃনগর ট্রেন ও উন্নতমানের কোচের দাবি জানিয়েছেন।
জামালপুর রেলওয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘এ অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতেই জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুর পর্যন্ত ডাবল লাইনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া জামালপুর থেকে সরিষবাড়ি হয়ে যমুনা সেতুর পূর্বপাড় পর্যন্ত মিটার গেজ লাইন স্থাপন করার পরিকল্পনা আছে। আর এ রুটে বেশ কিছু আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। লাইনের কাজ হয়ে গেলে যাত্রীদের সেবার মান বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামান বলেছেন, ‘ জয়দেবপুর থেকে জামালপুরের লাইনের মান উন্নয়ন হয়, সেই প্রজেক্ট তো চলছে। তবে ডাবল লাইনটা পরে হবে। দুই বছর থেকে নতুন কোচ আসছে না। যেগুলো আছে মেরামত করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন বলেছেন, রেলওয়ের উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পা রয়েছে। জনগণের পক্ষে সরকার ১৭ বছর কাজ করছে। জনগণ বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছে। জনগণের কল্যাণে সরকার কাজ করবে এটাই বাস্তবতা। রেলওয়ের উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা আছে। বিএনপি সরকারের নানামুখী পরিকল্পার মধ্যে এটাও রয়েছে।
জামালপুরবাসীর দাবি, জামালপুরের মানুষ ট্রেনের ওপর বেশি নির্ভরশীল ট্রেনের মানান্নোয়নে আমরা সচেষ্ট রয়েছি।





