মাছুয়াপাড়ায় একের পর এক খুনের পেছনে মাদক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পর এবার একই পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় সামনে এসেছে মাদকের বিস্তার ও কারবারিদের দাপটের অভিযোগ। চলতি বছরেই এলাকায় ঘটেছে আরও দুটি হত্যাকাণ্ড, যার নেপথ্যেও ছিল মাদক, আধিপত্য বিস্তার ও পুরনো বিরোধ। সর্বশেষ চার খুনের ঘটনায় দুজন গ্রেপ্তার হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও তাদের কাছে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ ওঠা কারবারি প্রশান্তসহ অন্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দাদের কাছে মাদকের বিষয়টি নতুন নয়। অভিযোগ রয়েছে, সন্ধ্যা নামার পর এলাকার বিভিন্ন স্থানে বসে চলে গাঁজা ও ইয়াবা সেবন, কেনাবেচা। শ্যামাসুন্দরী খালের ওপর দুই সেতুর আশপাশে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের আনাগোনা। কামাল কাছনা, মাছুয়াপাড়া, বৈরাগীপাড়া, তাঁতীপাড়া, নূরপুরসহ আশপাশের এলাকায় গাঁজা বিক্রির অভিযোগও দীর্ঘদিনের।
এমন এক পরিবেশেই গত ২২ আগস্ট নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ।
ঘটনাটি সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন এ ঘটনায়। পরে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রতিবেশী মুগ্ধ দাস (২৩) এবং সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। দুজনই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গ্রেপ্তার দুই যুবক ও সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের আগে তারা ইয়াবা সেবন করেছিলেন। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ২০ আগস্ট রাতের পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ প্রথমে ইয়াবা সেবন করেন। পরে আরও ইয়াবা সংগ্রহ করে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে তা সেবন শুরু করেন। ভোরের দিকে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠে তাদের দেখে ফেলেন। এরপরই ধারাবাহিকভাবে চারজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
কিন্তু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দুজন গ্রেপ্তার হলেও তাদের কাছে ইয়াবা বিক্রির অভিযোগ ওঠা প্রশান্ত এখনো পলাতক। পুলিশের দাবি, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। চার খুনের ঘটনার পর মাছুয়াপাড়ার পরিচিত অন্য মাদক কারবারিরাও গা ঢাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাদক কারবার ও সেবন দীর্ঘদিন ধরেই মাছুয়াপাড়ার সামাজিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে। ভয় ও আতঙ্কে এখন অনেকেই প্রকাশ্যে কারবারিদের নাম বলতে চান না। গণমাধ্যমের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলতে অনীহা দেখা যাচ্ছে অনেকের মধ্যে।
এর আগে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি মাছুয়াপাড়া সংলগ্ন তাঁতীপাড়ায় অটোচালক আমিনুল ইসলাম (৩৫) খুন হন। গাঁজা কাটার চাকু দিয়ে তাকে হত্যার অভিযোগ ওঠে বিজয় মোহান্ত নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। এরপর ১০ এপ্রিল মাছুয়াপাড়ায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রাকিব হাসান (২০) নামে এক যুবককে। পুলিশের ভাষ্য ছিল, মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধেই ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে। ঘটনার পর এলাকায় হামলা, ভাঙচুর ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে; কয়েকটি পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে চলে যায়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বললেন, মাছুয়াপাড়ায় আগের দুটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও মাদকের সম্পর্ক ছিল। তার অভিযোগ, বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ পর্যায়ে নাও পৌঁছতে পারত।
এদিকে, গতকাল শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন নবনিযুক্ত রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশিদ। সাংবাদিকদের তিনি বললেন, তদন্তের ধারাবাহিকতায় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চার খুনে মাদকের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করেছেন তিনি।







