পটুয়াখালীর গলাচিপা মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র
ভবন আছে চিকিৎসক নেই
- ১০ শয্যার হাসপাতাল চালু হয়নি ৮ বছরেও
- সেবাবঞ্চিত চরাঞ্চলের হাজারো মা ও শিশু

প্রায় ৬ কোটি টাকার স্থাপনা অচল
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার দক্ষিণ পানপট্টি এলাকায় প্রায় ৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০ শয্যার মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রটি আট বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষীর মতো। হাসপাতালের ভবন, রোগীদের শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, এমনকি চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবনও প্রস্তুত। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল না থাকায় এক দিনের জন্যও চালু হয়নি চিকিৎসাসেবা। ফলে দক্ষিণ পানপট্টিসহ
আশপাশের ইউনিয়ন ও চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ, বিশেষ করে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অন্তঃসত্ত্বা ও শিশুরা।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা না থাকলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজনই-বা কী ছিল?
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মা ও শিশুদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে দক্ষিণ পানপট্টি এলাকায় হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। প্রায় ৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনের কাজ শেষ হয় ২০১৮ সালের মার্চে। এরপর কেটে গেছে আট বছর। কিন্তু এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি হাসপাতালটি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের ভবন অক্ষত থাকলেও সেখানে নেই কোনো রোগীর আনাগোনা। শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র ব্যবহার না হওয়ায় অব্যবহৃত পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। চিকিৎসকদের আবাসিক ভবনও ফাঁকা। হাসপাতাল জুড়ে যেন জনশূন্যতার চিত্র।
অফিস সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এ ধরনের হাসপাতালে একজন মেডিকেল অফিসার, সেবিকা, টেকনিশিয়ানসহ প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা। কিন্তু এসব পদে এখনো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। বর্তমানে উন্নয়ন খাতের মাত্র একজন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। কয়েক মাস আগেও একজন টেকনিশিয়ান ছিলেন, তিনিও বদলি হয়ে গেছেন।
হাসপাতালে কর্মরত উন্নয়ন খাতের কর্মী কাজলরেখা বললেন, ‘বর্তমানে আমি একাই দায়িত্ব পালন করছি। এখানে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মতো কোনো জনবল নেই।’
স্থানীয় সমাজসেবক ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা বলেছেন, সরকারের উদ্দেশ্য ছিল মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা
মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু জনবল না থাকায় বাস্তবায়িত হয়নি সেই উদ্দেশ্য। দীর্ঘদিন
ধরে সরকারি অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান অচল পড়ে থাকায় হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
আক্ষেপের স্বরে দক্ষিণ পানপট্টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা বললেন, ‘হাসপাতালের সব অবকাঠামো আট বছর আগেই প্রস্তুত হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় মানুষ কোনো সেবা পাচ্ছে না। গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও সিজারিয়ান অপারেশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে জটিল রোগীদের পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়, যা দরিদ্র মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, দক্ষিণ পানপট্টি ও আশপাশের চরাঞ্চল থেকে উপজেলা সদর কিংবা পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে দীর্ঘ সময় লাগে। জরুরি প্রসূতি সেবা প্রয়োজন হলে অনেক পরিবারকে নদী ও সড়কপথ মিলিয়ে ভ্রমণ করতে হয় কয়েক ঘণ্টা। এতে অনেক সময় ঝুঁকির মুখে পড়ে রোগীর জীবনও।
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘যথাযথ জনবল না থাকায় এখানে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলাতেই চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন হলে দ্রুত হাসপাতালটি চালু করা সম্ভব হবে।’
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই আশ্বাস শুনলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাদের দাবি, কোটি টাকার অবকাঠামো অব্যবহৃত রেখে দেওয়ার পরিবর্তে দ্রুত চিকিৎসক, সেবিকা ও টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালটি চালু করা হোক। এতে দক্ষিণ পানপট্টিসহ আশপাশের চরাঞ্চলের হাজারো মা ও শিশু সহজেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাবেন এবং জরুরি চিকিৎসার জন্য ছুটতে হবে না দূরের হাসপাতালে।




