গর্তে থমকে যায় পথ

ছবি: আগামীর সময়
‘সড়কের কথা কইয়া লাভ নাই, বহুদিন দইরা সড়কটার এই দশা। এই সড়কের লাইগ্যা দুই লাইন লেইক্কেন, নয়া সরকার যাতে সড়কটা ঠিক কইরা দেয়।’
অটোরিকশার ভেতর বসে ক্ষোভ আর অসহায়ত্বের সুরে কথাগুলো বলছিলেন তাহের মিয়া। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামের এই বাসিন্দা পেশায় মোরগ ব্যবসায়ী। প্রতিদিনের মতো শনিবারও তিনি জগদীশপুর-শাহজিবাজার সড়ক ধরে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথ যেন এখন আর পথ নেই, বড় বড় গর্ত আর জমে থাকা পানিতে সড়কটি পরিণত হয়েছে দুর্ভোগের আরেক নামে।
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে সড়কটির বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, খানাখন্দে ভরা সড়ক দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। কোথাও গর্তে জমেছে হাঁটুসমান পানি, কোথাও আবার ভাঙা অংশ এড়িয়ে চলতে গিয়ে গাড়ি পড়ছে বিপাকে। সামান্য বৃষ্টি হলেই গর্তগুলো পানিতে ডুবে যায়। তখন বোঝার উপায় থাকে না কোনটি রাস্তা, আর কোনটি গভীর গর্ত।
আঞ্চলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলাচল করে। স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীরা জানান, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কটির অবস্থা দিন দিন ভয়াবহ হয়েছে। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ভারী যানবাহন গর্তে আটকে গেলে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী, পথচারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
মির্জাপুর মাছের আড়ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গর্তে আটকে বিকল হয়ে পড়ে আছে একটি কাভার্ডভ্যান। চালক ও স্থানীয় পথচারীরা মিলে অনেক চেষ্টা করেও সহজে গাড়িটি তুলতে পারছিলেন না। এ সময় সড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অপেক্ষমাণ যাত্রীদের কারও মুখে বিরক্তি, কারও চোখে ক্লান্তি।
অটোরিকশার আরেক যাত্রী রহমত আলী আগামীর সময়কে বললেন, ‘ভারী যানবাহন চলাচল ও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এক বছরের বেশি সময় ধরে সড়কের এই অংশের বেহাল অবস্থা চলছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।’
শুধু মির্জাপুর নয়, জগদীশপুর বাজারের দক্ষিণ পাশ, ইটাখোলা মালেক সুপার মার্কেট এলাকা, নোয়াপাড়া বাজারের দক্ষিণ পাশ ও মাদাড়গড়া এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এসব গর্তে পড়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
যাত্রী আছমা আক্তার জানান, ভারী যানবাহন চলাচলের সময় প্রায়ই গাড়ি গর্তে আটকে যায়। এতে তীব্র যানজট তৈরি হয়। সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানান।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হারুনুর রশিদ শাহিনের ভাষ্য, ‘দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির এমন বেহাল অবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।’
জগদীশপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদ খান আগামীর সময়কে বললেন, ‘সড়কটি খুবই বেহাল অবস্থায় রয়েছে। উন্নয়ন সভায় একাধিকবার সড়কটি মেরামতের দাবি জানিয়েছি। এমনকি প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছেও আবেদন করেছি। তিনি মোবাইল মেইনটেন্যান্সের মাধ্যমে কিছু কাজ করার কথা বললেও বাস্তবে কোথায় কাজ হয়েছে, তা আমি দেখিনি।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধবপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. রেজাউন নবী আগামীর সময়কে জানান, সড়কটির বিষয়ে তিনি অবগত নন। এ বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
পরে উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সোহেল আগামীর সময়কে জানান, সড়কটি বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। তিনি উল্লেখ করেন, 'সিলেট বিভাগ শক্তিশালী স্থায়িত্ব বৃদ্ধি ও প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির উন্নয়নের জন্য প্রাক্কলন প্রস্তুত করা হচ্ছে। আগামী জুলাই মাসের দিকে কাজ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।'
স্থানীয়দের আশা, আশ্বাস যেন আর শুধু কথায় আটকে না থাকে। কারণ এই সড়কে প্রতিদিন গর্তে আটকে যাচ্ছে শুধু যানবাহন নয়, আটকে যাচ্ছে মানুষের সময়, শ্রম আর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও।






