বাঁধহীন উপকূলে ঘর হারানোর আতঙ্ক

ছবি: আগামীর সময়
‘আমি এখন যাব কই? কার দুয়ারে আশ্রয় নেব?’- কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের জেলেপাড়া এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব নারী জন্নাত আরা।
অমাবস্যার প্রবল জোয়ারে তার বসতঘর পুরোপুরি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। এখন সন্তানদের নিয়ে ছেঁড়া পলিথিন টাঙিয়ে পানির মধ্যে মানবেতর জীবন কাটছে তার। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য নেই। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো সহায়তাও এখনো পাননি।
জন্নাত আরার মতো শত শত পরিবারের একই গল্প এখন মাতারবাড়ীর উপকূলে। কয়েকদিন আগের বন্যার পানি নেমে গেলেও শেষ হয়নি দুর্ভোগ। বরং প্রতিদিনের জোয়ার এখন নতুন বিপদের নাম। ভাঙা ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ দিয়ে নোনা পানি ঢুকে প্লাবিত করছে বসতভিটা, মাছের ঘের ও কৃষিজমি। প্রতিদিনই বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি। আর ঘর হারানোর আতঙ্কে দিন কাটছে উপকূলবাসীর।
সম্প্রতি সরেজমিনে মাতারবাড়ীর যাইটপাড়া, সাইরারডেইল, জেলেপাড়া ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁধ সম্পূর্ণ সাগরগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জোয়ারের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় চার থেকে পাঁচ ফুট বেশি উচ্চতার নোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এরই মধ্যে ধসে পড়েছে শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি। নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ।
বারবার জিওব্যাগ, কিন্তু মিলছে না স্থায়ী সমাধান
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। মাঝেমধ্যে জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও বর্ষার স্রোত ও উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে সেগুলো দ্রুত সরে যায়। এরপর আবার শুরু হয় নতুন ভাঙন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর ভাষ্য, যাইটপাড়ার অন্তত এক কিলোমিটার অরক্ষিত বেড়িবাঁধের পাশে শত শত পরিবার বসবাস করছে চরম ঝুঁকিতে। দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ না হলে যাইটপাড়া ও জেলেপাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা সাগরে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মিজবাহ উদ্দীন বললেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা এরই মধ্যে পাউবো পরিদর্শন করেছে। আপাতত জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পেলে স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালামের দাবি, প্রতিবছর একই দুর্ভোগ। আর কত আশ্বাস শুনব? দায়সারা জিওব্যাগ নয়, স্থায়ী সমাধান চাই।
মানববন্ধনে ক্ষোভ, পুনর্বাসনের দাবি
টেকসই বেড়িবাঁধ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের দাবিতে গত ১৯ জুলাই মাতারবাড়ীর সাইরারডেইলসংলগ্ন জালিয়াপাড়া এলাকায় শত শত মানুষ মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন।
এতে বক্তারা অভিযোগ করেন, দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উন্নয়ন প্রকল্প, উপকূলীয় ভাঙন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জালিয়াপাড়া, সাইটপাড়া ও বাহিরপাড়ার চার শতাধিক ঘরবাড়ি এরই মধ্যে সাগরে বিলীন হয়েছে।
সাবেক ইউপি সদস্য হামেদ হোসেন বলেছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। এটি উপকূলের মানুষের বাঁচার আন্দোলন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী আজগরের ভাষায়, আমরা উন্নয়নের বিরোধী নই। কিন্তু উন্নয়নের কারণে যদি আমাদের ভিটেমাটি হারাতে হয়, তাহলে সেটি আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ।
বদলে যাচ্ছে মাতারবাড়ীর উপকূল
১৯৮৪ থেকে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ের ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট চিত্র এবং সাম্প্রতিক সময়ের গুগল আর্থ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত চার দশকে মাতারবাড়ীর ভূপ্রকৃতিতে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে।
প্রথমদিকে প্রাকৃতিক উপকূল, লবণমাঠ ও কৃষিজমি ছিল স্থিতিশীল। কিন্তু ২০১৫ সালের পর বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দর, জেটি, সংযোগ সড়ক ও ড্রেজিং প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে উপকূলের স্বাভাবিক গতিশীলতায় বড় পরিবর্তন ঘটে।
২০২৫ সালের সর্বশেষ চিত্রে দেখা যায়, একদিকে সমুদ্র ভরাট করে নতুন শিল্পভূমি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে কৃষিজমি, লবণমাঠ এবং বসতি ক্রমাগত ক্ষয়ের মুখে পড়ছে।
ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) প্রধান নির্বাহী এম ইব্রাহিম খলিল মামুনের মতে, এই পরিবর্তন শুধু প্রাকৃতিক ভাঙনের ফল নয়, বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, ড্রেজিং, ব্রেকওয়াটার এবং ভূমি ভরাটও উপকূলীয় গতিশীলতায় বড় প্রভাব ফেলছে।
জলবায়ুর প্রভাব আরও বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট (আইডব্লিউএফএম)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ উপকূলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে গড়ে ৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার বেড়েছে, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাপী যেখানে প্রতিবছর সমুদ্রের পানির উচ্চতা গড়ে ৩.৭ মিলিমিটার বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশের উপকূলে এর হার ৪.২ থেকে ৫.৮ মিলিমিটার। পানি বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে এবং সুপেয় পানি ও কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস ও বন্যায় উপকূলীয় জনপদ ও অবকাঠামোগুলো চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
গবেষণার প্রধান অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলামের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, জোয়ারের তীব্রতা এবং জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে। এর ফলে উপকূলীয় ভাঙনও বাড়বে। একই সঙ্গে ভূমি ধসে যাওয়ার (সাবসিডেন্স) কারণে ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক সময়ের গবেষণায়ও বলা হয়েছে, দেশের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির হার দেশের অন্য অংশের তুলনায় বেশি।
উন্নয়নে হারিয়েছে জীবিকা
মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে হাজার হাজার একর লবণ মাঠ ও কৃষিজমি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লবণচাষি, মৎস্যজীবী ও চিংড়ি পোনা সংগ্রহকারীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা কাদের আলীর ভাষ্য, আগে নদীতে মাছ ধরতাম, লবণমাঠে কাজ করতাম। এখন সমুদ্রে ভাঙন, আর প্রকল্পে জমি- দুটোতেই সব হারিয়েছি।
আকবর হোসেনের ভাষায়, একদিকে সমুদ্র, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প- দুটোই এখন আমাদের গলার কাঁটা। ঘরও নেই, জীবিকাও নেই।
দ্রুত পদক্ষেপের দাবি
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মাতারবাড়ী ও ধলঘাট এলাকায় তাদের ৩২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাকি প্রায় ১৮ কিলোমিটার বাঁধও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম দাবি করেছেন, মহেশখালী উপজেলার ধলঘাট ও মাতারবাড়ী এলাকার বেড়িবাঁধের কয়েকটি অতিঝুঁকিপূর্ণ অংশে জরুরি সংস্কারের অনুমতি পাওয়া গেছে। ঠিকাদাররা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের মতে, কেবল জিওব্যাগ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই বেড়িবাঁধ, নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন। এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন না করলে মাতারবাড়ীর উপকূল আগামী বছরগুলোতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
উপকূলের মানুষের প্রশ্ন এখন একটাই, আর কত ঘর সাগরে বিলীন হলে মিলবে একটি টেকসই বেড়িবাঁধ?




