এক প্রকল্পে দুইবার বরাদ্দ, তদন্ত শুরু

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা পরিষদের যমুনা আবাসিক ভবন। ছবি: আগামীর সময়
মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে একই প্রকল্পে দুই দফায় বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। ওই উন্নয়ন প্রকল্পে একই ধরনের কাজের জন্য দুই দফায় বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি টাকা।
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর বগুড়া জেলা প্রশাসকের গঠিত তদন্ত দল গত বুধবার উপজেলা পরিষদে গিয়ে নথিপত্র পর্যালোচনা করেছে।
তদন্ত দলে আছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর মনোনীত প্রতিনিধি শাকিউল ইসলাম এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন। তদন্ত দল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা শাখা-২ থেকে জারি করা আলাদা দুটি প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনায় দেখা যায়, একই অর্থবছরে উপজেলা প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক ভবন ও সড়ক মেরামতের প্রায় একই ধরনের প্রকল্পে দুই দফায় ৫০ লাখ টাকা করে মোট ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
প্রথম প্রজ্ঞাপনটি জারি হয় ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। প্রজ্ঞাপনে সই করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ। এতে উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা খাত থেকে আদমদীঘি উপজেলার ছয়টি প্রকল্পের জন্য ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল উপজেলা কৃষি অফিস পর্যন্ত আরসিসি সড়ক নির্মাণ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনের সড়ক মেরামত, উপজেলা পরিষদের নতুন ও পুরনো প্রশাসনিক ভবনের সংস্কার এবং যমুনা ও রূপসা আবাসিক ভবনের সংস্কার।
এরপর ২০২৬ সালের ১০ মে জারি করা হয় আরেকটি প্রজ্ঞাপন। এতে সই করেন একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সুলতানা আক্তার। প্রজ্ঞাপনে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় উপজেলা পরিষদের পুরনো প্রশাসনিক ভবন, নতুন প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন সড়ক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনের প্রবেশপথ, উপজেলা কৃষি অফিসের সামনের সড়ক এবং যমুনা ও রূপসা আবাসিক ভবনের মেরামতের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় আরও ৫০ লাখ টাকা।
দুই প্রজ্ঞাপনের প্রকল্প তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই অবকাঠামোকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ কাজ। এ কারণে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে একই ধরনের কাজের জন্য আবার বরাদ্দ দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলা পরিষদ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নতুন প্রশাসনিক ভবনের সাজসজ্জাসহ বেশির ভাগ দৃশ্যমান উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজার দায়িত্বকালেই।
অন্যদিকে, উপজেলা কৃষি অফিসের সামনের সড়ক মেরামতের জন্য দুই দফা বরাদ্দ থাকলেও সেখানে পাওয়া যায়নি দৃশ্যমান কোনো কাজ। রূপসা আবাসিক ভবনের অনেকগুলোতে চিহ্নও নেই সংস্কারের। ভবনের দেয়ালে শ্যাওলা জমেছে এবং দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকার চিত্র স্পষ্ট। যমুনা আবাসিক ভবনের বারান্দায় গাছপালা জন্মেছে, দেয়াল ও ছাদে শ্যাওলা দেখা গেছে। ভবনের জানালার পাললাও নষ্ট হয়ে রয়েছে। চারটি ফ্ল্যাটের মধ্যে মাত্র একটিতে বসবাস করছে একটি পরিবার।
এদিকে উপজেলা পরিষদের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণের কাজ চলমান থাকলেও দুই প্রজ্ঞাপনের কোনো প্রকল্পে এ কাজের উল্লেখ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফায় নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হলেও মন্ত্রণালয় ভুলবশত আবার বরাদ্দ দিয়েছে আগের প্রকল্পগুলোর নামেই। পরে উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় দুই বরাদ্দ সমন্বয় করে অনুমোদন করা হয়েছে নতুন কাজের তালিকা। কাজ চলছে সে অনুযায়ীই।
উপজেলা প্রকৌশলী রিপন কুমার সাহা আগামীর সময়কে জানান, কাজে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া এভাবে কাজ করা ঠিক হয়নি।
একই প্রকল্পের দুইবার বরাদ্দের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র আগামীর সময় বলেছেন, ‘আমাদের তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করার কাজ চলছে। পরে এটি জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হবে।’





