জাজিরা
পদ্মার তীব্র ভাঙন, ঝুঁকিতে বাজার-বিদ্যালয়সহ ৫০০ পরিবার

ছবি: আগামীর সময়
পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে শরীয়তপুরের জাজিরার পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকায় নতুন করে ভাঙন দিয়েছে। এখন পর্যন্ত ভাঙনে ইটের রাস্তা ও ৩টি বিদ্যুতের খুঁটিসহ প্রায় ১০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্তর জিরো পয়েন্ট থেকে পালেরচর পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), শরীয়তপুর।
ভাঙনের আতঙ্কে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাঝিরঘাট ও পালেরচর বাজারসহ আশপাশের এলাকার ৩ কিলোমিটার এলাকায় প্রায় ৫০০ পরিবার রয়েছে। গত কয়েকদিনে ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা নিজেদের বসতঘর ও দোকান সরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে রবিবার বিকাল পর্যন্ত ২৫টি বসতঘর ও সাতটি দোকান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ভাঙনের খবর পেয়ে সরেজমিনে মঙ্গলবার পাউবোর কর্মকর্তারা কাথুরিয়া এলাকায় যান। এ সময় শরীয়তপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান জানান, নদীতে পানি ও স্রোত বৃদ্ধি পাওয়ায় হঠাৎ ভাঙন দেখা দিয়েছে। জিরো পয়েন্ট রক্ষা প্রকল্পের ৩ কিলোমিটার অংশ এই মুহূর্তে ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশের মধ্যে ৫ কিলোমিটার অংশের কাজ ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার অংশের কাজ চলছে। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় এই মুহূর্তে নদীতে কাজ বন্ধ। তবে ঠিকাদাররা ব্লক তৈরির কাজ করছেন। আর কাথুরিয়া এলাকায় ভাঙন দেখা দেওয়ায় সেখানে বালু ভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।
সরেজমিনে কাথুরিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীর তীরে গোলাকারে মাটি ধসে পড়ছে। একের পর এক মাটির বড় অংশ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় নিজেদের বসতঘর ও দোকানঘর ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি সরিয়ে নিচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও সড়কের ইট তুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়।
এ সময় বেশ কয়েকজন নারীকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। ভাঙনে বসতভিটা ও শেষ সম্বল হারানোর আশঙ্কায় তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা ও আতঙ্ক।
ভিটে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়া স্থানীয় বাসিন্দা নাজমা বেগম (৬০), সালেম শরীফের স্ত্রী, আগামীর সময়কে বলেন, গত ৪০ বছরে ছয়বার ভাঙনের শিকার হয়েছি। অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়ে ১০ কাঠা জমি কিনেছিলাম। এখন সেই ১০ কাঠা জমিও নদী খেয়ে নিচ্ছে, সব নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
তিনি জানালেন, বর্ষাকাল এলেই পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধের কাজ শুরু করে। কিন্তু শীতকালে যদি তারা বাঁধের কাজ করত, তাহলে হয়তো আমার শেষ সম্বলটুকু হারাতে হতো না। তারা শুধু অস্থায়ী বাঁধ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। দুইদিন পর পর এসে শুধু কয়েকটা বালুর ব্যাগ ফালায়, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। এখন কোথায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে, জানি না। অন্যের জায়গায় গিয়ে ঘরবাড়ি খুলে রাখছি।
নিজের দুটি বসতবাড়ির আসবাবপত্র, ঘরের টিনের চালা ও বেড়া খুলে নিতে দেখা যায় মানিক ঘরামির ছেলে মজিস ঘরামিকে। কন্যাসন্তানদের ও স্ত্রীকে নিয়ে তাকে ঘরবাড়ি সরানোর কাজে ব্যস্ত দেখা যায়।
তিনি বললেন, ইঞ্জিনচালিত ভ্যান চালাই আমি। সকাল ৭টার দিকে ভ্যান নিয়ে জীবিকার জন্য বের হই। হঠাৎ দেখি নদী সবকিছু ভেঙেচুরে নিয়ে যাচ্ছে। এ সময় চিৎকার দিলে স্থানীয়রা দৌড়ে আসে। প্রতিবেশীদের নিয়ে বাড়িঘর ভাঙতে শুরু করি। ৮ কাঠা জায়গা পুরোটা পদ্মা নদী ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। পাঁচ কন্যাসন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বিপদে আছি। তাদের নিয়ে কোথায় যাব, বুঝতে পারছি না।
পাউবো সূত্র জানায়, জাজিরার নাওডোবা ইউনিয়নের পদ্মা সেতু এলাকা থেকে জাজিরা ইউনিয়নের পাথালিয়াকান্দি এলাকা পর্যন্ত ১০ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করছে পাউবো। ৩৯টি গুচ্ছ প্রকল্পের (প্যাকেজ) মাধ্যমে এতে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের জিরোপয়েন্ট এলাকা থেকে পাথালিয়াকান্দি এলাকা পর্যন্ত ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হয়। ২০২৫ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের রক্ষাবাঁধে ভাঙন দেখা দিলে প্রকল্পের সঙ্গে আরও ২ কিলোমিটার যুক্ত করা হয়।
প্রকল্পটির জিরোপয়েন্ট এলাকা থেকে পালেরচর পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার এলাকায় গত বছর ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়। তখন বেশ কয়েকটি প্যাকেজের অংশের বাঁধের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে গত বছর জুন থেকে ওই অংশের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রকল্পের ওই অংশের ১৪টি প্যাকেজের নকশা পরিবর্তন করে এ বছর মে মাসে আবার কাজ শুরু করা হয়। পাউবোর নির্ধারিত ঠিকাদাররা বালু ভর্তি জিওব্যাগ ফেলার কাজ করছিলেন।
প্রকল্পের ১২ ও ১৩ নম্বর প্যাকেজের কাথুরিয়া এলাকায় সাত দিন ধরে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে ২০০ মিটার এলাকার নদীতে ফেলা বালু ভর্তি জিওব্যাগ ভেসে গেছে। সোমবার সকালে কাথুরিয়া-মাঝিরঘাট সড়কের ৫০ মিটার অংশ নদীতে বিলীন হয়ে যায় বিকাল পর্যন্ত ১০০ মিটার এলাকা বিলীন হয়। তিনটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের তিনটি খুঁটি বিলীন হয়েছে। নদীর তীরে থাকা সাতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে। আর ভাঙন শুরু হওয়ায় গত সাত দিনে ২০টি বসতবাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।





