বাম্পার ফলন, তবু লোকসান
মাঠভরা আলুই কেড়েছে কৃষক মীরের ঘুম!
- আলু চাষে আগ্রহ কমছে কৃষকের
- সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ফসল
- মৌসুমেই কম দামে বিক্রিতে বাধ্য কৃষক

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
জমিতে আলুর বাম্পার ফলন হলেও মুখে হাসি নেই কৃষক জামাল মীরের। চোখের সামনে বেড়ে ওঠা মাঠভরা আলুই এখন তার রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। কোথায় রাখবেন এত আলু, কীভাবে সংরক্ষণ করবেন, লাভ তো দূরের কথা, খরচটুকু উঠে আসবে কি না— সে ভাবনায় চোখে অন্ধকার দেখছেন তিনি।
জামাল মীরের নিজের নেই কোনো জমি। সংসারের চাকা ঘোরাতে তাই অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ফসল ফলান। ভোরের কুয়াশা ভাঙার আগেই নামেন মাঠে, দিনভর চলে পরিশ্রম।
এ বছর আমন ধান বিক্রি করে জমানো ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ১২৫ শতাংশ জমি বর্গা নিয়েছিলেন বলে জানালেন জামাল। ভালো দামের আশায় সেই জমিতে করেছিলেন আলুর চাষ। ফলনও হয়েছে বেশ।
কিন্তু মাঠভরা এই আলুর স্তূপ আশীর্বাদ নয়; বরং নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জীবনে।
আর এ গল্প পটুয়াখালীর গলাচিপার একজন কৃষকের নয়। এই গল্প যেন হাজারো কৃষকের একটানা লড়াই— মাটির সঙ্গে, দামের সঙ্গে আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে।
জামালের সঙ্গে কথা হলে উঠে আসে তার হতাশার কারণ। বললেন, ‘২ লাখ টাকার মতো খরচ হইছে কীটনাশক আর শ্রমিকের পেছনে। ফলন ভালো হইছে, কিন্তু দাম পাইতেছি না। বিক্রি কইরা খরচই উঠতেছে না।’
এখন বাজারের যে অবস্থা তাতে চালান থাকে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান তিনি। এদিকে হিমাগারের অভাবে নেই সংরক্ষণের কোনো উপায়। আকাশে মেঘ দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে— একটু বৃষ্টি এলেই সব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তখন শুধু ফসল নয়, ভেসে যাবে তার পুরো মৌসুমের স্বপ্ন।
শুধু জামাল নন, একই চিত্র উপজেলার অনেক কৃষকের। আলু চাষি আইয়ুব হাওলাদার জানালেন, প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা খরচ করেও বিক্রি করতে হচ্ছে ১৫-২০ হাজার টাকায়। প্রতি বিঘায় গুনতে হচ্ছে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান।
রেজাউল মাতুব্বরের কণ্ঠেও একই হতাশার ছাপ। 'সব খরচ মিটায়া হাতে কিছুই থাকে না' — বলেই থেমে যান তিনি।
স্থানীয় কৃষক আম্বিয়া যেন এ সংকটের কথাই আরও স্পষ্ট করলেন, 'সকাল থেইকা বিকাল খাটি, দুইডা টাহার লাইগা। বাজারে দাম নাই, আলু রাহার জায়গাও নাই— যে কারণে মাঠেই কুডা দিয়া ঢাইকা রাহি আলু। যদি পরে বাজারে দাম বাড়ে, তাইলে বিক্রি করমু। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি আইলেই এই আলু ভিজে নষ্ট হয়ে যায় — তহন মোগো কপাল পুইড়া যায়।’
সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে ভালো দাম পাওয়া যেত বলেও আশা প্রকাশ করলেন তিনি।
তিন বছর আগেও বরিশাল বিভাগে শীর্ষ আলু উৎপাদনকারী জেলা ছিল পটুয়াখালী। কিন্তু সংরক্ষণ সংকট আর দামের অস্থিরতায় সেই আবাদ কমেছে অর্ধেকের বেশি। গলাচিপায় ২০২৪ সালে যেখানে ৪০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছিল, ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ২৬০ হেক্টরে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছর পটুয়াখালীতে ১ হাজার ৩৫ হেক্টরে আলুর চাষ হলেও এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬১৩ হেক্টরে।
এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও। গলাচিপা উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা মো. আকরামুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ২৫ টন উৎপাদন হলেও সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন মৌসুমেই কম দামে বিক্রি করতে। ফলে লোকসান যেন প্রতি বছরেরই গল্প।
চলতি বছর ৩৬৫ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তা অর্জন সম্ভব হয়নি কৃষকদের অনাগ্রহে— অভিযোগ আকরামুজ্জামানের। সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা না হলে আগামীতে আবাদ আরও কমে যাবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করলেন তিনি।
পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমানুল ইসলামের মতে, এই অঞ্চলে আলু উৎপাদনের সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে বিকল্প নেই হিমাগারের। চলতি বছর ১৭০ কৃষককে বিএডিসির মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে বীজ, সার ও ঋণসহায়তা উল্লেখ করে তিনি বললেন, উৎপাদিত আলুর একটি অংশ বরিশালের হিমাগারে সংরক্ষণ করা গেলেও অধিকাংশই স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে।
তবে আশার আলো দেখাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান উল্লেখ করেন, একটি হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা চলছে স্থানীয় ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। অল্প সময়ের মধ্যেই নেওয়া হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
কিন্তু ততদিন পর্যন্ত জামাল মীরের মতো কৃষকদের প্রতিটি দিন কাটবে অনিশ্চয়তায়। মাঠে ফলন যতই ভালো হোক, ন্যায্য দাম আর সংরক্ষণের অভাবে সেই ফসলই যেন হয়ে উঠছে তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

