বন্দর হয়েছে, সুফল মেলেনি

পাথর আমদানি না হওয়ায় অলস পড়ে আছে কামালপুর স্থলবন্দরের পাথরভাঙা ক্রাশার মেশিন। ছবি: আগামীর সময়
১৯৭৪ সালে যাত্রা শুরু ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন হিসেবে। ২০১৫ সালে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর। ইমিগ্রেশন চালুর জন্য খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা; কিন্তু নেই নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে গড়ে তোলা এই বন্দরের সুফল পাচ্ছেন না স্থানীয়রা।
প্রায় তিন মাস ধরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরে। ঈদুল আজহার ছুটিতে সাত দিনের জন্য বন্ধ হওয়ার পর আর চালু হয়নি কার্যক্রম। পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় অলস পড়ে আছে বন্দরের শত শত পাথরভাঙা ক্রাশার মেশিন। এতে একদিকে সরকার হারাচ্ছে সম্ভাব্য কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বন্দরের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৮ হাজার শ্রমিক ও ব্যবসায়ী।
ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন ও বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় পাঁচ মাস এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ছয় মাস বন্ধ ছিল বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও এখন পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ বছরের বড় একটি সময়ই কার্যত অচল থাকছে সম্ভাবনাময় এই স্থলবন্দর। দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিলসহ পরিচালন ব্যয় মেটাতে বছরে কয়েক কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে সরকারকেও।
ব্যবসায়ীদের দাবি, পাথরের সঙ্গে আসা মাটি ও বালুর ওপর শুল্ক, অতিরিক্ত চার্জ, ভারতীয় অংশের সড়কের বেহাল এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে বন্দরে ব্যবসা করা দিন দিন লোকসান হয়ে উঠেছে। এ কারণে তারা আমদানি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের দাবি, ব্যবসায়ীদের বারবার আমদানিতে ফিরতে বলা হলেও লোকসানের আশঙ্কায় তারা পাথর আমদানি করছেন না।
১৯৭৪ সালে ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা ধানুয়া কামালপুরে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন হিসেবে বন্দরটির যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০১৫ সালের ২১ মে এটি পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপ নেয়। ইমিগ্রেশন চালুর লক্ষ্যে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি না থাকায় এর সুফল মিলছে না।
এই বন্দর দিয়ে পাথর, কয়লা, চুনাপাথর, গবাদি পশু, মাছের পোনা, তাজা ফলমূল, গাছগাছড়া ও উদ্ভিদ, বীজ, গম, পেঁয়াজ, আদা, মরিচ, রসুন, কাঁচা সুপারি, কাঠ ও রাসায়নিক সারসহ প্রায় ৩৪ ধরনের পণ্য আমদানির অনুমোদন রয়েছে। তবে বর্তমানে বন্দরটি মূলত পাথর আমদানির ওপরই নির্ভরশীল। অন্যান্য পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক ও খরচ থাকায় সেগুলোর আমদানিও বন্ধ আছে দীর্ঘদিন ধরে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বন্দর চালুর পর ধানুয়া কামালপুরসহ আশপাশের এলাকার ৭-৮ হাজার মানুষ পাথরভাঙা, ট্রাক শ্রমিক, হোটেলসহ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হন। বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এসব শ্রমিক। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে সংসার চালাতে ঋণ করছেন। কিস্তি দিতে পারছেন না। অনেক পরিবারে দেখা দিয়েছে চরম আর্থিকসংকট।
পাথরভাঙা শ্রমিক খোকন মিয়া বলেছেন, ‘আমদানি বন্ধ থাকায় আমাদের কাজও বন্ধ। সংসার চালাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। বাজারের খরচ ও কিস্তি চালানোও কঠিন হয়ে গেছে। দ্রুত পাথর আমদানি শুরু না হলে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।’
পাথর ব্যবসায়ী মো. মাহফুজুল হক জানিয়েছেন, পাথরের সঙ্গে আসা মাটির ওপর শুল্ক ও অতিরিক্ত চার্জ থাকায় আমদানি চালু করা কঠিন। আমদানি বন্ধ থাকায় ৭-৮ হাজার শ্রমিকসহ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বন্দর সচল রাখতে শুল্ক বিভাগকে বাস্তবসম্মত ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিকাশ দত্ত জানালেন, বছরের বেশির ভাগ সময়ই এই বন্দরের আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকে।
বছরে তিন-চার মাস আয় করে শ্রমিকদের পক্ষে সারা বছর সংসার চালানো সম্ভব নয়। পাথরের সঙ্গে বালু আসায় সেই বালুর ওপরও শুল্ক দিতে হয়। এসব কারণে ব্যবসায়ীরা আমদানিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
ধানুয়া কামালপুর স্থলবন্দরের রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আবুল হোসেন আকন্দ জানিয়েছেন, ভারতীয় অংশে ভাঙা সড়ক মেরামতের কাজ চলছে। পাশাপাশি লোকসানের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় আমদানি বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে এবং দ্রুত আমদানি চালু হবে।
আগামী এক মাসের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু না হলে স্থলবন্দরটি বন্ধের সুপারিশ পাঠানোর নির্দেশনা আছে বলেও জানালেন তিনি।







