বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস
এখনও তামাকের বৃত্তেই বন্দি রংপুর

ছবি: আগামীর সময়
আজ ৩১ মে, বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। বিশ্বজুড়ে নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হলেও রংপুর অঞ্চলের চাষিদের পিছু ছাড়ছে না ক্ষতিকর এই তামাক। এক সময়ে তামাকের জন্য বিখ্যাত এই অঞ্চলে সরকারের নানামুখী নিরুৎসাহিতকরণ পদক্ষেপ সত্ত্বেও কমেনি এর আবাদ। বিকল্প ফসল হিসেবে চলতি বছর রংপুর জেলায় ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আলু চাষ হলেও তামাকের চাষে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। মূলত বিকল্প ফসলের বীজ প্রাপ্তিতে জটিলতা, উচ্চ উৎপাদন খরচ, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং কোল্ড স্টোরেজ বা সংরক্ষণ সুবিধার অভাব চাষিদের আবার সেই তামাকের দিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এর ওপর তামাক কোম্পানিগুলোর দেওয়া অগ্রিম ঋণ ও তামাক কেনার শতভাগ নিশ্চয়তা কৃষকদের এই ক্ষতিকর চাষে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এক সময়ে তামাকই ছিল রংপুর অঞ্চলের প্রধান ফসল। তামাক সংশ্লিষ্ট দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে এখানকার ‘ভার্জিনিয়া’ জাতের তামাকের কদর ছিল আকাশচুম্বী। তামাককে ঘিরে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা দেশব্যাপী এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিনা পুঁজিতে ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন। সেই সুবাদে বিড়ি, সিগারেট, গুল ও জর্দাসহ তামাক সংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এই অঞ্চলে। এলাকার চাষিদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের ১৯০৮ সালের এক সার্ভে অনুযায়ী রংপুরের বুড়িরহাটে স্থাপিত হয় একটি তামাক গবেষণা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটি দেশ-বিদেশ থেকে ১১৪টি তামাকের জাত সংগ্রহ করার পাশাপাশি ‘সুরভি’ ও ‘সুগন্ধি’ নামের দুটি উচ্চ ফলনশীল জাতসহ বেশ কিছু নতুন জাতের উদ্ভাবন করেছিল।
পরবর্তীতে তামাকের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এর চাষ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে একসময়ের বৃহৎ তামাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি’ (বিটিসি)-র রংপুর ডিপো বন্ধ হয়ে যায়। ঐতিহ্যবাহী তামাক গবেষণা কেন্দ্রটিরও রূপ বদলে নাম দেওয়া হয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৮৫ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি তামাকের বিকল্প হিসেবে ভুট্টা, সূর্যমুখী, সরিষা, বাদাম ও বিভিন্ন শাকসবজি চাষের ওপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে কৃষকরা তামাকের চেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন। কিন্তু এত কিছুর পরও তামাকের উৎপাদন কমানো যাচ্ছে না।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি রবি মৌসুমে রংপুর জেলায় কাগজে-কলমে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে, যদিও বাস্তবে এর পরিমাণ অনেক বেশি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ এক হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে শুধু গঙ্গাচড়া উপজেলায়। এছাড়া রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও কাউনিয়া উপজেলাতেও ব্যাপক তামাকের আবাদ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগ মনে করে, বাপ-দাদার আমল থেকে চাষ করায় তামাকের উৎপাদন কৌশল কৃষকদের নখদর্পণে। খুব সহজে ঘরেই এর বীজ সংরক্ষণ করা যায় এবং আলু বা অন্য ফসলের মতো এটি পচে যাওয়ার ভয় নেই বলে সংরক্ষণেও বাড়তি কোনো খরচ হয় না। তাছাড়া অন্যান্য ফসলের তুলনায় তামাকের নিশ্চিত দাম ও ভালো বাজার পাওয়া যায়।
বাস্তব চিত্র দেখতে গঙ্গাচড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মাঠ থেকে তামাক কাটার কাজ শেষ হলেও এখনো বাড়ির উঠানে কিংবা খোলা জায়গায় চলছে তামাক শুকানোর ধুম। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের কলাগাছি, শংকরদহ ও ইচলি চরে যাওয়ার পথে মহিপুর ঘাটে পৌঁছালেই স্থানীয় মাঝিরা স্বভাবসুলভ কণ্ঠে প্রশ্ন করেন, ‘তামাকের চর যাইমেন বাহে?’ শুকনো মৌসুমে তিস্তার ধূ ধূ বালুচর যেন আসলেই একেকটি তামাকের চরে পরিণত হয়।
কলাগাছি চরের তামাক চাষি হামিদ মিয়া অকপটে জানান, তামাক আবাদই এখন তাদের টিকে থাকার একমাত্র ভরসা। সারা বছর তারা এই মৌসুমের অপেক্ষায় থাকেন। একই এলাকার সাদেকুল ইসলাম বিকল্প চাষের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বললেন, ‘বিকল্প ফসল হিসেবে আলু আবাদে অনেক টাকার দরকার হয়, যা আমাদের মতো ক্ষুদ্র কৃষকদের পক্ষে জোগাড় করা কঠিন। কিন্তু তামাক চাষ করলে কোম্পানিগুলো থেকেই আগাম ঋণ পাওয়া যায়।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন বিড়ি ফ্যাক্টরির তামাক ক্রয় ও প্রসেসিং কেন্দ্রগুলোর তদারকিতে তিস্তার চরাঞ্চলসহ গঙ্গাচড়ার কৃষকদের তামাক চাষে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি অগ্রিম পুঁজি বা ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে ক্ষতিকর জেনেও ঋণের জালে আটকে এবং নিশ্চিত লাভের আশায় যুগ যুগ ধরে তামাকের এই বৃত্ত থেকে বের হতে পারছেন না রংপুরের চাষিরা।






