অপেক্ষার পর সেন্টমার্টিনে জাহাজ, প্রথম দিনেই ৮৩৭ পর্যটক

কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে পর্যটক নিয়ে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এমভি বার আউলিয়া। ছবি: আগামীর সময়
নানা অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে অবশেষে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে ৮৩৭ জন পর্যটক নিয়ে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে এমভি বার আউলিয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সমুদ্রপথে দ্বীপ ভ্রমণের সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত পর্যটকেরা। জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যেও।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে জাহাজটি ঘাট ছাড়ার আগে ভোর ৬টা থেকেই নুনিয়ারছড়ায় জড়ো হতে থাকেন পর্যটকেরা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর জাহাজের হুইসেল বাজতেই উৎসবমুখর হয়ে ওঠে ঘাট এলাকা। তবে আনন্দের এই যাত্রার প্রথম দিনেই টিকিটের বাড়তি দাম ও ঘাটে ভোগান্তি নিয়ে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন পর্যটক।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক হৃদয় বলেছেন, ‘এবারের মতো হয়রানি আগে কখনো হয়নি। অনলাইনে টিকিট কাটার পরও যদি ভোগান্তিতে পড়তে হয়, তাহলে সাধারণ পর্যটকদের কী অবস্থা হবে? এবার সর্বনিম্ন টিকিটের দাম ৪ হাজার ২০০ টাকা। আগে ছিল ৩ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ টিকিটপ্রতি ৭০০ টাকা বেড়েছে। সবকিছুর দাম শুধু বাড়ছেই, কমছে না। এতে আমরা মর্মাহত।’
তবে প্রথমবার সেন্টমার্টিন যাওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত পর্যটক পপি সাবরিন জেসি। তার ভাষ্য, ‘আগে কখনো সেন্টমার্টিন যাওয়া হয়নি। এবার প্রথমবারের মতো দ্বীপে যাচ্ছি। মৌসুমের প্রথম দিন হওয়ায় আনন্দ ও উত্তেজনা আরও বেশি।’ অফিসারদের একটি দলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গাইড হিসেবেও তিনি দ্বীপে যাচ্ছেন বলে জানান।
জাহাজ চলাচলের পাশাপাশি প্রথম দিন থেকেই সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কড়াকড়ি আরোপ করেছে প্রশাসন। ঘাটে দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা। পর্যটকদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ও সাউন্ডবক্স জাহাজে নিতে দেওয়া হয়নি। এসব সামগ্রী নির্ধারিত স্থানে রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পরিবেশ রক্ষায় কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে মাইকিং করে পর্যটকদের সচেতনও করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেছেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। দ্বীপের কেয়াবনে প্রবেশ, ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়া, পার্টি আয়োজন ও উচ্চ শব্দ সৃষ্টি নিষিদ্ধ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকাণ্ডও করা যাবে না।
তার ভাষ্য, ‘পর্যটকদের সঙ্গে থাকা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল ও অন্যান্য সামগ্রী ঘাটে নির্ধারিত স্থানে রেখে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকটি সাউন্ডবক্সও পর্যটকদের কাছ থেকে বুঝে নিয়ে জাহাজ মালিকদের কাছে রাখা হয়েছে।’ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে চলতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম বলেছেন, প্রথম দিন প্রায় ৮৩৭ টিকিট বিক্রি হয়েছে, যা জাহাজটির মোট ধারণক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারের নির্দেশনা এবং প্লাস্টিক ও সাউন্ডবক্স বহন না করার বিষয়ে পর্যটকদের সচেতন করা হয়েছে।
সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বললেন, ‘আজ ৮৩৭ যাত্রী নিয়ে এ মৌসুমের প্রথম জাহাজ যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের অবসান হতে যাচ্ছে।’
তিনি জানালেন, এবারের মৌসুমে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে সেন্টমার্টিন রুটে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রথম দিন শুধু এমভি বার আউলিয়া যাত্রী পরিবহন করেছে। এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ শুক্রবার থেকে যাত্রী পরিবহন শুরু করবে।
স্কোয়াব সূত্রে জানা গেছে, তিন জাহাজের মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০, এমভি কর্ণফুলির ৭৩২ এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, এমভি বার আউলিয়া সকাল ৭টা, এমভি কর্ণফুলি সকাল ৭টা ১৫ মিনিট এবং এমভি টেকনাফ সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে ছাড়ার কথা। ফিরতি যাত্রায় জাহাজগুলো যথাক্রমে দুপুর ২টা ৩০ মিনিট, দুপুর ২টা ১৫ মিনিট ও বিকেল সাড়ে ৩টায় সেন্টমার্টিন ঘাট ছাড়বে।
হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ নভেম্বর থেকেই পর্যটক পরিবহনের কথা থাকলেও প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক জটিলতায় পাঁচ দিন পিছিয়ে ৫ নভেম্বর থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। যাত্রার আগে জাহাজগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাসহ সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থাও পরিদর্শন করেছে প্রশাসন।
বুধবার সন্ধ্যায় কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীতে নোঙর করে রাখা হয় তিন পর্যটকবাহী জাহাজ। যাত্রী পরিবহনের উপযোগী করতে সংস্কার, সাজসজ্জা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে প্রথম জাহাজ হিসেবে যাত্রা করে এমভি বার আউলিয়া।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানিয়েছেন, আগে থেকে টিকিট সংগ্রহ করা পর্যটকদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সকাল ৭টায় নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে জাহাজটি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। এ সময় ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ রয়েছে। দ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রয়েছে আরও নানা বিধিনিষেধ। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি ও বারবিকিউ পার্টি নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচার পাশাপাশি সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয় এমন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।





