পারিশ্রমিকের বদলে লেবুর চারা, বদলে গেল সোহানের জীবন

লেবুচাষি সোহান— আগামীর সময়
একদিনের পাওনা ছিল মাত্র ৮৫০ টাকা। সেই অর্থের বদলে হাতে এসেছিল কয়েকটি চারা। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, সেই চারাগাছই একদিন বদলে দেবে এক তরুণের জীবন। ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের পাশাপাশি কৃষির প্রতি ভালোবাসা থেকে বারোমাসি লেবুর বাগান করে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার চুয়ারিয়াখোলা গ্রামের মো. সোহান।
২০১৭ সালে এক আত্মীয়ের কাছে ইলেকট্রিকের কাজ শেখার সময় সোহানের পারিশ্রমিক বাবদ ৮৫০ টাকা পাওনা ছিল। নগদ অর্থ দিতে না পারায় তিনি বিকল্প হিসেবে কয়েকটি লেবুর চারা নেন। সেই চারাগাছই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে মাত্র পাঁচ শতক জমিতে শুরু হয় তার লেবুচাষের যাত্রা। শুরুতে ছোট পরিসরে শুরু হলেও ধীরে ধীরে পরিচর্যা, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমে সেই বাগান আজ পরিণত হয়েছে বৈচিত্র্যময় এক লেবু উদ্যানে।
বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে ৯ জাতের ৫০টিরও বেশি বারোমাসি লেবু গাছ। এর মধ্যে রয়েছে কলম্বো, কাগজি, হাইব্রিড কাগজি, গোল কাগজি, সিডলেস, চায়না থ্রি, গন্ধরাজ, জারা ও এলাচি জাত। প্রতিদিনই পাইকাররা তার বাগান থেকে সরাসরি লেবু সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যান। মাঝেমধ্যে এসব লেবু মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও পৌঁছে যায়।
বছরের সব সময়ই লেবুর চাহিদা থাকলেও ফাল্গুন, চৈত্র ও বৈশাখ মাসে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন প্রতিটি লেবু ৭ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়। আবার অফ-সিজনে এক হালি লেবুর দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। এতে সারা বছরই তার আয় অব্যাহত থাকে।
সোহান শুধু লেবু বিক্রিতেই থেমে থাকেননি। তিনি লেবুর চারা ও কাটিং উৎপাদন করে বাড়তি আয়ের পথও তৈরি করেছেন। তার কাছ থেকে চারা নিয়ে অনেকেই নতুন করে লেবুবাগান গড়ে তুলছেন। এতে চুয়ারিয়াখোলা গ্রাম ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে ‘লেবুর এলাকা’ হিসেবে।
স্থানীয় শিক্ষক মিজানুর রহমান মোড়ল বলেছেন, ‘সোহানের সাফল্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সময়কে কাজে লাগানো। অফ-সিজনে যখন বাজারে লেবুর সংকট দেখা দেয়, তখনই তার বাগানের লেবুর দাম সবচেয়ে বেশি থাকে।’
সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরা যুবক শাহিন মিয়া জানান, বিদেশে দীর্ঘদিন থাকার পর তিনি দেশে ফিরে কৃষিতে কিছু করার পরিকল্পনা করছেন। সোহানের বাগান দেখে তিনি এক একর জমিতে বারোমাসি লেবু চাষের উদ্যোগ নিতে আগ্রহী হয়েছেন।
প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন বললেন, ‘সোহানের বাগানের লেবুর ঘ্রাণ ও স্বাদ আলাদা। অনেক প্রবাসী দেশে এলে তার কাছ থেকে লেবু কিনে নিয়ে যান। স্থানীয় বাজারেও এসব লেবুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদী জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় সোহান সফলভাবে বারোমাসি লেবু চাষ করছেন। তার এই উদ্যোগ এলাকার অন্যান্য কৃষকদেরও উৎসাহিত করছে।
একসময় ৮৫০ টাকার পারিশ্রমিকের বিকল্প হিসেবে নেওয়া কয়েকটি চারাগাছ থেকেই যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং একটি এলাকার কৃষিভিত্তিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের গল্প।





