টাকা পেলে বনেই করতে দেন ভিটা-বাড়ি ও চাষাবাদের সুযোগ

ছবি: আগামীর সময়
নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকা হাতিয়ার সাগুড়িয়া রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় এবং ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে। টাকা পেলেই বনভূমি দখল, গাছ কেটে ভিটা-বাড়ি নির্মাণ, দোকানঘর স্থাপন ও চাষাবাদের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি মধু আহরণ এবং খাল ইজারা নিয়েও নানা কারসাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এমনকি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে হেল্প প্রকল্পের আওতায় চরআলিম ও ভাসানচরে ৪২০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বন সৃজনের সরকারি প্রায় ৮৮ লাখ ২০ হাজার টাকা বনের অস্তিত্ব না রেখেই আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি সরেজমিন অনুসন্ধানে সংরক্ষিত বনভূমির একাধিক স্থানে গাছ কেটে জমি পরিষ্কার করা, নতুন ভিটি নির্মাণ, বসতি স্থাপন এবং চাষাবাদ চলার চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয়রা জানায়, বুড়িরচর ইউনিয়নের আলাদিগ্রাম বাজারের দক্ষিণ পাশে চরআলিম বেড়িবাঁধ সংলগ্ন কালাম মাঝির বাড়ির পাশে প্রায় একশ একর বনভূমি ধাপে ধাপে পরিষ্কার করে বসতি স্থাপন করা হয়েছে। গত সপ্তাহে তিন দিনের ব্যবধানে নিজাম চৌধুরীর মাধ্যমে এস্কেভেটর মেশিন ব্যবহার করে ৯টি ভিটি নির্মাণ ও ঘর তোলার বিনিময়ে প্রতি ভিটি থেকে ২০ হাজার টাকা করে সংগ্রহ করেছেন স্থানীয় ফরেস্ট ক্যাম্পের মোহসীন ও জুয়েল, যা সরাসরি রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
যোবায়ের, আশরাফ ও মাইনউদ্দিনসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন সকালে বেড়িবাঁধ সংলগ্ন আলতাফ মাঝির ছেলে মো. সুমন ক্যাম্পের মোহসীনকে ৫০ হাজার টাকা এবং প্রভাবশালী নিজাম চৌধুরীকে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে বনের ভেতর ৩৬ শতক জায়গায় ভিটি ও গৃহ নির্মাণ করেন। তবে মোহসীন দাবি করেন, ভিটি নির্মাণ ও জায়গা দখলের ছবি রেঞ্জ কর্মকর্তার মেসেজে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলেছেন।
এছাড়া আলাদিগ্রাম বাজারের পশ্চিম পাশে এনাম নামের এক প্রভাবশালী প্রায় ২০ একর বনভূমি দখল করে চাষাবাদ শুরু করেছেন এবং বন ও ভূমি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চাষাবাদকৃত বনভূমির প্রায় চার একর জায়গা ১০টি ভূমিহীন পরিবারের কাছে বিক্রি করেছেন, যে কার্যক্রমে বন বিভাগের বোটচালক আবুল হাসেম ও ক্যাম্প স্টাফ মোহসীনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
টানবাজার দক্ষিণ পাশে চরআলিম বন কেটে আড়াই একর জায়গায় এস্কেভেটর দিয়ে রাতারাতি বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে ভুট্টো নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে, যেখানে নির্মাণ শুরুর তিন ঘণ্টা আগে বোটচালক আবুল হাসেম এক লাখ টাকার চুক্তি সম্পন্ন করার পর বন বিভাগের কেউ আর ঘটনাস্থলে যায়নি বলে স্থানীয়রা জানান। এর উত্তর-পূর্ব কোণে আলাউদ্দিন মাঝি বনের প্রায় ৫০টি গাছ কেটে জায়গা পরিষ্কার করেছেন। লালচর এলাকায় পূর্বে উচ্ছেদ হওয়া তিনটি দোকানঘর পুনর্নির্মাণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্থানীয় খোকন আক্ষেপ করে বললেন, ‘এই জায়গার ব্যাপারে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, হাজতও খেটেছি। অথচ সুবিধা ভোগ করে এখন অন্যরা।’
চরআলিম বিটের দায়িত্ব সরাসরি রেঞ্জ কর্মকর্তার অধীনে থাকায় কাদিরার খাল, আলিজ্জার খাল, পচার খাল, পরীক্ষিত খাল ও বুড়িরদোনা খাল ইজারা এবং বনের মধু আহরণ নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম করা সহজ হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে সাগুড়িয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বললেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। বন রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে স্টাফদের দায়িত্ব দেওয়া আছে।’
এ বিষয়ে নোয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের কর্মকর্তা ও সহকারী বন রক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে উপকূলীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম স্পষ্ট করে জানান, অভিযোগগুলো তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এভাবে দখল, দুর্নীতি ও অনিয়ম চলতে থাকলে উপকূলীয় পরিবেশ, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং সরকারি সংরক্ষিত সম্পদ মারাত্মক ঝুঁকির দিকে ধাবিত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।




