জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিং
প্রতীক্ষার ফ্লাইওভার কতদূর
- প্রতিশ্রুতিতেই আটকে আছে অর্ধশতাব্দী
- লেভেল ক্রসিংয়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট
- রেললাইনের পাশে বসছে অস্থায়ী দোকান
- ফুটপাত দখলে সংকুচিত চলার পথ

সকালের অফিসযাত্রা কিংবা স্কুল-কলেজে যাওয়ার তাড়া, গাজীপুরের মানুষের কাছে জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিং মানেই অনিশ্চিত অপেক্ষা। কখন নামবে রেলগেট, কতক্ষণ আটকে থাকতে হবে, কিংবা গন্তব্যে পৌঁছাতে আরও কত সময় লাগবে— এসব হিসাব যেন হয়ে গেছে নিত্যদিনের অংশ।
শহরের মাঝখানে থাকা একটি লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে দিনের পর দিন যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে লাখো মানুষকে। রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী— কেউই মুক্ত নন ভোগান্তি থেকে। অথচ এই সংকট নিরসনে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি নতুন নয়; অর্ধশতাব্দী ধরে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে থাকলেও বাস্তবে দেখা মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সেই অবকাঠামোর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর থেকে সরকার বদলেছে, পাল্টেছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পৌরসভা থেকে হয়েছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু শহরের প্রাণকেন্দ্র জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিংয়ের ওপর ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি থেকে গেছে একই জায়গায়। তবে এবার আশার আলো দেখছেন গাজীপুরবাসী। স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মধ্যেই উদ্যোগ নেওয়া হবে ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের। যদি সেটি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে অবসান ঘটতে পারে অর্ধশতাব্দী অপেক্ষার।
গাজীপুর মহানগরীর কেন্দ্রস্থলেই জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিং। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আদালত, সরকারি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাকেন্দ্র— শহরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় যেতে অতিক্রম করতে হয় রেলক্রসিং।
শিববাড়ি থেকে রথখোলা পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি -মো. শওকত হোসেন সরকার, প্রশাসক, গাজীপুর সিটি করপোরেশন
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেন আসার আগে প্রায় ১০-১৫ মিনিট বন্ধ থাকে রেলগেট। খোলার পরও যানবাহনের দীর্ঘ সারি স্বাভাবিক হতে লেগে যায় অনেক সময়।
স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন বললেন, ‘ট্রেন আসার অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয় গেট। এখানে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থাকায় রোগীদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। অনেক সময় হাসপাতালে নেওয়ার পথে যানজটে আটকে থেকে রোগীর অবস্থার আরও অবনতি হয়।’ তার মতে, বহুদিন ধরে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে ফ্লাইওভার নির্মাণের দাবি জানানো হলেও বাস্তব অগ্রগতি দেখা যায়নি।
রাজধানীর অন্যতম প্রবেশদ্বার গাজীপুর। দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি হিসাবে এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও ব্যবসায়িক যানবাহনের চলাচল রয়েছে। গত কয়েক দশকে শিল্পায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগর সম্প্রসারণের ফলে যানবাহনের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি।
গাজীপুর মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক এম এ বারী বিষয়টিকে দীর্ঘদিনের নাগরিক সংকট হিসেবে দেখেন। ‘প্রায় ৫০ বছর ধরে গাজীপুরবাসীর একটি বড় প্রত্যাশা হলো জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিংয়ের ওপর ফ্লাইওভার নির্মাণ। এখানে সবসময় লেগেই থাকে যানজট। অনেকেই বলেছেন, গাজীপুরের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের নাম জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিং’—বললেন তিনি।
তার মতে, একটি ওভারপাস বা ফ্লাইওভার নির্মিত হলে নগরবাসীর দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে।
ক্রসিংয়ের দুই পাশে সারি সারি রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়ি অপেক্ষারত। গেট খোলার পর একসঙ্গে শত শত যানবাহন চলাচল শুরু করায় সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। সমস্যা আরো বাড়িয়েছে ফুটপাত দখল করে থাকা দোকান ও হকাররা। অনেক স্থানে পথচারীর জন্য নির্ধারিত জায়গা হয়ে পড়েছে সংকুচিত— রেলগেট গেলে এমন চিত্রই চোখে পড়ে।
রেললাইনের পাশ ঘেঁষে ফলসহ বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী দোকান। ট্রেন আসার সময় দ্রুত পণ্য সরিয়ে নেন দোকানিরা। ট্রেন চলে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসেন আগের অবস্থানে। এমন পরিস্থিতি প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই অনুসরণ করা হয় নির্ধারিত নিয়ম। তবে নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিকোণ থেকে যানজট নিরসনে বিকল্প অবকাঠামো প্রয়োজন।
জয়দেবপুর রেল জংশনের স্টেশন মাস্টার হানিফ আলীর ভাষ্য, নিয়ম ও সময় মেনেই রেলগেট বন্ধ ও খোলা হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন। প্রতিদিন চলাচল করে ৫২ জোড়া ট্রেন। ফলে বারবার নামাতে ও তুলতে হয় গেট।
স্থানীয়দের দাবি, ১৯৮৬ সালে গাজীপুর জেলা গঠনের পর প্রতিষ্ঠিত হয় পৌরসভা। ২০১৩ সালে গঠিত হয় গাজীপুর সিটি করপোরেশন। কিন্তু জেলা সদর ও সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় এলাকায় এখনো নির্মাণ হয়নি ফ্লাইওভার। যেখানে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে একাধিক উড়ালসড়ক নির্মিত হয়েছে, সেখানে শিল্পনগরী গাজীপুর কেন এতদিন পিছিয়ে থাকবে— প্রশ্ন নগরবাসীর।
অবশ্য ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী লেহাজ উদ্দিন। তিনি বলেছেন, ‘জাইকার তৃতীয় প্রকল্পের আওতায় জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিংয়ের ওপর একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাসন ইসলামপুর থেকে কাশিমপুর সংযোগে দুটি সেতুও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, নকশা প্রস্তুতসহ প্রাথমিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে এরই মধ্যে। আর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার জানিয়েছেন, জয়দেবপুর স্টেশনের দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে শিববাড়ি থেকে রথখোলা পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এটি বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম।






