ডুমুরিয়ায় বুড়িভদ্রা খনন
বেদনা জাগাতে কে হায় এমন নদী খোঁড়ে
- মাটিতে চাপা পড়েছে ৯ ঘর
- উচ্ছেদে গৃহহারা ১৪৫ পরিবার

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজারের পাশেই খোলা মাঠ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে অস্থায়ী কোনো শ্রমিক শিবির। কাছে গেলে দেখা যায় পুরনো টিন, পলিথিন আর কাপড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট ঝুপড়ি। প্রচণ্ড রোদ, কাদা আর বৃষ্টির মধ্যে এখানেই দিন কাটাচ্ছেন শত শত মানুষ। অথচ পাঁচ মাস আগে তাদের স্থায়ী ঠিকানা ছিল বুড়িভদ্রা নদীর চরে গড়ে ওঠা আশ্রয়ণ প্রকল্পে। এখন সেই ঘর নেই, আছে শুধু স্মৃতি আর পুনর্বাসনের অপেক্ষা।
স্থানীয়দের দাবি, নদী খনন প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ হওয়া অন্তত ১৪৩টি পরিবার এখন বাস করছে খোলা স্থানে। নদী খননের মাটির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরেকটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের অন্তত ৯টি ঘর।
চুকনগর বাজারের পাশের অস্থায়ী বসতিতে দেখা হয় সহিদুল গাজীর সঙ্গে। তিনি বললেন, উচ্ছেদের আগে পর্যাপ্ত সময় বা বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা ছিল না।
‘ঘর ভাঙার পর মাঠে আশ্রয় নিয়েছি আমরা। টিন আর পলিথিন দিয়ে ঝুপড়ি বানিয়ে থাকছি। দিনে প্রচণ্ড রোদে থাকা যায় না, আবার বৃষ্টি হলে পানি ঢুকে যায় ঘরে। রোহিঙ্গারাও আমাদের চেয়ে ভালো আছে’— বললেন তিনি।
একই আক্ষেপ কল্যাণী সরকারের কণ্ঠেও, ‘সরকার আমাদের নামে দুই শতক জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছিল। সে ঘরেই থাকতাম সাতজন। এখন থাকতে হচ্ছে মাঠে। বিদ্যুৎ নেই, বিশুদ্ধ পানিও নেই। শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। ঘর ভাঙার সময় বলা হয়েছিল পুনর্বাসন করা হবে দ্রুত; কিন্তু এখনো কিছুই হয়নি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুড়িভদ্রা নদীর চরে চুকনগর অংশে ১৪৫টি এবং কাঁঠালতলা-বরাতিয়া অংশে ১২৪টি ঘর নির্মাণ করেছিল সরকার। পাঁচ মাস আগে বুড়িভদ্রা নদী খনন শুরু হওয়ায় চুকনগর অংশে উচ্ছেদ করা হয় ১৪৩টি ঘর। বর্তমানে সেখানে অক্ষত আছে মাত্র দুটি ঘর।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, নদীর চরের ভেতরে আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনাগত ত্রুটির ফলেই সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতি।
চুকনগর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলাউদ্দীন মাঝির ভাষায়, সরকার নির্মাণ করেছে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ঘর; কিন্তু নদীর মাঝখানে প্রকল্প করায় এখন সেই বিনিয়োগ পড়েছে প্রশ্নের মুখে।
চুকনগরে উচ্ছেদের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন সংকটে পড়েছেন কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। নদী খনন করে তোলা বিপুল পরিমাণ মাটি ঘরগুলোর পাশে রাখা হয়েছে স্তূপ করে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেই মাটির চাপেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ৯টি ঘর।
বর্ষা শুরু হওয়ার পর মাটির স্তূপ ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা বেগম জানালেন, খননের মাটি পাহাড়ের মতো উঁচু করে রাখা হয়েছে।
‘বৃষ্টির সময় সেই মাটি ধসে তিন বছরের এক শিশু চাপা পড়েছিল। পরে আশপাশের লোকজন উদ্ধার করায় বেঁচে যায় সে’— বললেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, খুলনা ও যশোর অঞ্চলে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খননকাজ চলছে।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জীর ভাষ্য, প্রকল্পে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের জন্য নেই অর্থ বরাদ্দ। এ কারণে প্রকল্পের আওতায় সম্ভব নয় পুনর্বাসন।
তিনি জানালেন, বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে রাখা মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায়।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা; কিন্তু ডুমুরিয়ার চুকনগরে সেই প্রকল্পের বাসিন্দাদেরই এখন খোলা মাঠে আশ্রয় নিতে হচ্ছে।
বিষয়টি বহুবার প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হেলালউদ্দীন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘প্রায় এক হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বাস করছে খোলা স্থানে। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, খাবারের কষ্টও আছে তাদের।’
একদিকে নদী খনন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে আশ্রয়হীন মানুষের মানবিক সংকট— দুই বাস্তবতার মাঝখানে আটকে পড়েছে প্রায় এক হাজার মানুষের জীবন। পুনর্বাসনের আশ্বাস মিললেও কবে তারা আবার স্থায়ী ঠিকানায় ফিরতে পারবেন— সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
অবশ্য বরাতিয়া প্রকল্পে জমে থাকা মাটি সরিয়ে নেওয়া ও ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার।
তবে চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়ে তিনি বললেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে বিষয়টি; কিন্তু এখনো আসেনি কোনো সিদ্ধান্ত।’




