চট্টগ্রামে নবীন প্রবীণের ভোট আনন্দ

সংগৃহীত ছবি
সাইদুল কবির চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানের বাসিন্দা সাইদুল প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন। ভোট দিয়ে বললেন, এটা জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ। আমরা তরুণরা আর মার্কা দেখে নয়, ব্যক্তির যোগ্যতা দেখে ভোট দিচ্ছি।
৮৬ বছর বয়সী নরেশ চন্দ্র ধর নগরীর হাজারী লেইনের বাসিন্দা। পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রথম ভোট দিয়েছিলেন তিনি। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত স্থানীয়-জাতীয় মিলে যত নির্বাচন হয়েছে, প্রায় সব নির্বাচনেই ভোট দিয়েছেন বলে জানালেন নরেশ চন্দ্র। নরেশ বললেন, ভোট আমার অধিকার। এ পর্যন্ত কোনো ইলেকশন মিস হয়নি। জীবিত থাকা অব্দি যতটা নির্বাচন হবে, প্রত্যেকটাতে ভোট দেব।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দিনে আজ বৃহস্পতিবার কেন্দ্রে-কেন্দ্রে সৃষ্টি হয় নবীন-প্রবীণের এমন মেলবন্ধন। প্রথমবার ভোট দেওয়া নবীনদের মধ্যে যেমন ছিল উচ্ছাস-উদ্দীপনা, অভিজ্ঞ ও প্রবীণ ভোটারের চোখমুখে ছিল উৎসবে শামিল হওয়ার গভীর তৃপ্তিও!
তরুণ সাইদুল কবির ভোট দিয়েছেন চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনের আওতাধীন নগরীর জামালখান ওয়ার্ডের ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি বলেন, প্রথমবার ভোট দিয়েছি। খুব ভালো লাগছে। ভোটের পরিবেশটা খুব ভালো। আপাতত সকালে তেমন কোনো ভিড় ছিল না। অন্যান্য নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের বাইরে থেকে আব্বু-আম্মুর ভোট দেওয়া দেখতাম। এবার আমি নিজেই দিলাম। অন্যরকম উচ্ছাস কাজ করছে। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমরা আসলে মার্কা দেখে নয়, ব্যক্তির যোগ্যতা দেখে ভোট দিচ্ছি। যোগ্য ব্যক্তিই আমাদের তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ধরে রাখতে পারবে বলে আমরা মনে করি।
একই আসনের আওতাধীন নগরীর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন প্রবীণ স্বর্ণশিল্পী নরেশ চন্দ্র ধর। ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি বলেন, ভোট দেওয়া প্রয়োজন। ভোট আমার অধিকার। সত্তরের নির্বাচনে প্রথম ভোট দিয়েছিলাম। এরপর যত নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল, সব নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। বয়স ৮৫ পার হয়ে গেছে। আর কদিন বাঁচবো জানি না। বেঁচে থাকতে আরও সুযোগ পেলে ভোট দেব।
নগরীর বৌদ্ধমন্দির এলাকায় ন্যাশনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন ২০ বছর বয়সী তরুণ কলেজ ছাত্র মোহাম্মদ সাফওয়ান। ভোট দেওয়ার পর তিনি বলেন, এবার প্রথম ভোট দিলাম। জুলাই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। আমি একজন জুলাই যোদ্ধা। প্রথমবার ভোট দিয়ে খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, এই যে গণতন্ত্রের যাত্রা, এখানে আমারও সামান্য অংশগ্রহণ আছে। গত রাতে বিভিন্ন জায়গায় কেন্দ্র দখলের খবর পাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম, প্রথম ভোটটা দিতে পারবো কী না। আজ এসে দেখলাম, ভোটের পরিবেশটা সুন্দর আছে।
নগরীর কদমমোবারক এম ওয়াই উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বেসরকারি পোর্ট সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সেঁজুতি দাশ বলেন, ভোটার হয়েছি তিন বছর আগে। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি যে নির্বাচনটা হয়েছিল, সেবার ভোট দিতে যাইনি। তখন ভোট দেওয়া প্রয়োজন এটা মনে হয়নি। ভোটের কোনো পরিবেশ ছিল না। এবার পরিবেশ ভালো। প্রথমবার ভোট দিয়ে খুব ভালো লাগছে।
চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, হালিশহর, খুলশী) আসনের আওতাধীন নগরীর খুলশী রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ গার্লস হাইস্কুল ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল আরেক চিত্র। প্রায় ৭০ বছর বয়সী বিউটি দাশ নাতনির হাত ধরে লাঠিতে ভর দিয়ে এসেছেন ভোটকেন্দ্রে। ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি বলেন, শরীর ভালো না। হাঁটতে পারি না। বাসা থেকে বারবার বলেছিল যেন ভোট দিতে না আসি। কিন্তু ভোট না দিলে ভালো লাগে না। এটা একটা আনন্দ আর কী!
এভাবেই উৎসবমুখর পরিবেশে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলোতে চলছে ভোটগ্রহণ। জানা গেছে, শহরের কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি গ্রামগঞ্জের ভোটকেন্দ্রগুলোতেও সকাল থেকে ভোটারের উপস্থিতি প্রচুর। বিকাল ৩টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পওয়া যায়নি।
মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। বৃহস্পতিবার সকালে বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নের বাণীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, জাতির অনেক দিনের প্রত্যাশা এ ভোটে ভোটারদের ঢল নেমেছে। মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে’ ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, সমগ্র চট্টগ্রামের সব কেন্দ্রে সঠিক সময়ে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে।
সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমদ খান বলেন, আনোয়ারা উপজেলা হয়ে আমরা বাঁশখালী আসলাম। কোথাও কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর শুনিনি। আমাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা আছে। আশাকরি মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেবেন।



