বালিয়াকান্দি
অনিয়ম-দুর্নীতির ভারে ডুবছে প্রাথমিক শিক্ষা

বালিয়াকান্দি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. তাজমুন্নাহার
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. তাজমুন্নাহারের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, তদন্তে হস্তক্ষেপ, সরকারি বিল জিম্মি, শিক্ষক হয়রানি এবং চরম প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বালিয়াকান্দির প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছে।
উপজেলার প্রধান শিক্ষকদের দাবি, ৯৯টি বিদ্যালয়ের স্লিপ ফান্ডের প্রায় ২০ লাখ টাকা, প্রাক-প্রাথমিকের ৭ লক্ষাধিক টাকা এবং বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ৪ লক্ষাধিক টাকা বিদ্যালয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া সত্ত্বেও তারা তা তুলতে পারছেন না। ব্যাংকে চিঠি দিয়ে একাউন্ট ফ্রিজ করে রেখেছেন বলে দাবি শিক্ষকদের।
সোনালী ব্যাংক, বালিয়াকান্দি শাখার ব্যবস্থাপক মোতাহার হোসেন আগামীর সময়কে জানালেন, শিক্ষা অফিসার তাজমুন্নাহার স্লিপ ফান্ড ও প্রাক-প্রাথমিকসহ কিছু বিল জমার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ রাখার জন্য একটি চিঠি দিয়েছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তার প্রত্যয়ন ছাড়া শিক্ষকরা যেন কোনো বিল উত্তোলন করতে না পারেন।
সম্প্রতি অবসরে যাওয়া এক শিক্ষকের পেনশন ফাইল আটকে টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, টাকা না দেওয়ায় রাজবাড়ী জেলা অফিস থেকে ফোন করে আমার ফাইল ফেরত আনেন তাজমুন্নাহার। পরে বাধ্য হয়ে টাকা দেওয়ার পর সেই কাগজপত্র আবার জেলায় পাঠানো হয়। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে একতা নেই। অন্য একটি অডিও রেকর্ডে আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষককে আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায়, শিক্ষা কর্মকর্তাকে ৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে, এখানে কিছু বলার নাই।
এ ছাড়া ৪৩ জন শিক্ষকের বেতন সমতাকরণের ফাইল নিষ্পত্তির জন্য ৭৫ হাজার টাকা এবং পিআরএল, পেনশন ও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বিল ছাড় করতেও লাখ লাখ টাকা অনৈতিকভাবে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বেতাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও প্রাথমিক শিক্ষক পরিবারের সভাপতি সবুর খান অভিযোগ করেন, চাকরি স্থায়ীকরণের জন্য ১০১ জন শিক্ষকের কাগজপত্র সুপারিশসহ জমা দেওয়া হলেও, শিক্ষা কর্মকর্তা মাত্র ৫ জনের ফাইল পাঠিয়েছেন। বাকি ৯৬ জনের ফাইল ঘুষ না পাওয়ায় আটকে রাখা হয়েছে।
কোমরদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিরুপম চৌধুরী অর্থ বছর চলে গেলেও ভোট কেন্দ্র সংস্কারের টাকা না পাওয়ার বিষয়টি জানান।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রাশিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, শিক্ষা অফিসার তাজমুন্নাহার যোগদানের পর থেকেই অনিয়মিতভাবে অফিস করতেন। পরে বিভিন্ন বিল, পেনশন, বেতন সমতাকরণের বকেয়া, স্লিপ ফান্ডের অর্থ ছাড়, পিআরএল ও অন্যান্য প্রশাসনিক ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রেখে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ঘটনাও রয়েছে। ভোটকেন্দ্র সংস্কারের দ্বিতীয় কিস্তির বিলও দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়েছে। ১ জুলাই ২০২৬ সালের তদন্তের নোটিশ গোপন করে অধিকাংশ প্রধান শিক্ষককে না ডেকে কেবল কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে ডাকা হয়।
চরবহরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষা কমিটির সদস্য ফজলুর রহমান বললেন, তার যোগদানের পর উপজেল শিক্ষা কমিটির সভা হয়নি, দুয়েকটি মাসিক সমন্বয় সভা হলেও তিনি সেখানে উপস্থিত হননি। মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষা কর্মকর্তার কোনও ভূমিকা নেই।
শিক্ষক রফিকুল ইসলামসহ একাধিক শিক্ষকের মতে, একক সিদ্ধান্তে পুরো উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে। তিনি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কোনও কাজেই তার অফিসের কর্মকর্তা বা শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করেন না। চলতি বছরে প্রথম প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ব্যবসার জন্য পুরো উপজেলায় অতিরিক্ত দামে একই প্রশ্ন সবাইকে নিতে বাধ্য করেন।
স্বাবলম্বী ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেশসেরা প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বললেন, ১ তারিখের তদন্তে আমি কোনও নোটিশ পাইনি। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের স্লিপ ফান্ডের টাকাও পাইনি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. তাজমুন্নাহারের মুঠোফোনে ফোন করলে তিনি সাংবাদিক পরিচয়ে কেটে দেন। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ ও মোবাইল নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।
রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. তবিবুর রহমান বললেন, বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি অবগত। স্কুলের একাউন্টে বিল দিয়ে ম্যানেজারকে পত্র দিয়ে বিল বন্ধের বিষয়টি খতিয়ে দেখে অধিদপ্তরকে অবহিত করা হবে।
ঢাকা বিভাগীয় উপ-পরিচালক মো. আবদুল আজিজের ভাষ্য, অভিযোগ অনেক। কাগজপত্র দেখে বলতে হবে। একসময় অফিসে আসেন।
অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন এই প্রতিবেদককে জানান, বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়ে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হবে।
২০২৫ সালে বালিয়াকান্দিতে যোগদানের আগেও ধামরাই, নগরকান্দা ও নরসিংদীর শিবপুরে কর্মরত থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও ১০% কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। নগরকান্দায় শিক্ষকদের টাইম স্কেল ও ভাতা উত্তোলনে জনপ্রতি ৭ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার পর লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে ধামরাই থেকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল। এমনকি তার পূর্বের কর্মস্থলের প্রায় ৩ লাখ টাকা বাসা ভাড়া বকেয়া থাকার বিষয়টিও ইএলপিসিতে (ELPC) উল্লেখ রয়েছে।




