লক্ষ্মীপুরে মেঘনার ভাঙন
দৃশ্যমান হয়নি বাঁধ, বাধা কোথায়
- ১৯৯৫ সাল থেকে শুরু হলেও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে ২০০৮ সালে
- ১০২ প্যাকেজে বাঁধ নির্মাণ হওয়ার কথা ৩১ কিলোমিটার
- গত বছর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দৃশ্যমান হয়নি অর্ধেকও

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর মধ্যে একটি লক্ষ্মীপুর। জোয়ার-ভাটায় আবদ্ধ এ অঞ্চলের মানুষের জীবন। পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময় নদীতে বাড়ে পানির উচ্চতা। আছড়ে পড়ে ঢেউ। তলিয়ে যায় ঘরবাড়ি। পানি যখন নামতে শুরু করে, তখন দেখা দেয় ভাঙন। অনেক আগে থেকেই টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি ছিল মেঘনাপাড়ের বাসিন্দাদের। নতুন করে বাঁচার স্বপ্নও দেখা শুরু করেন, ২০২২ সালে যখন মেঘনার তীরে বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। সে স্বপ্নও অনেকটা মিলিয়ে যাচ্ছে ভাটার টানে। গত বছরের ডিসেম্বরে বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। অথচ এখনো দৃশ্যমান হয়নি অর্ধেকও।
বাঁধ না থাকায় কয়েক যুগ ধরে কমলনগর ও রামগতি উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ একে একে গ্রাস করেছে মেঘনা। সর্বহারা মানুষ নদীর চরে খুঁজে বেড়াচ্ছেন নতুন আশ্রয়। তাদেরই একজন আলাউদ্দিন। এ পর্যন্ত ৯ বার মেঘনার ভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি।
ষাটোর্ধ্ব আলাউদ্দিন একসময় থাকতেন রামগতি উপজেলার চরআলগী গ্রামে। মেঘনার ভাঙনে হারিয়েছেন সবই। এখন ঘর বেঁধেছেন চররমিজ ইউনিয়নের চরগোসাই গ্রামে। স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন সেখানে।
একসময় জমিজিরাত সবই ছিল। এখন কিছুই নাই -আলাউদ্দিন, মেঘনাপাড়ের বাসিন্দা
‘একসময় জমি-জিরাত সবই ছিল। এখন কিছুই নাই। কাজ করেন অন্যের জমিতে। কাজ না পেলে ওঠেন নৌকায়। মাছ ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের খরচ।’ আক্ষেপ করে বলছিলেন আলাউদ্দিন।
চরগোসাই গ্রাম— এখন যেখানে তার বসতি, সেখান থেকে মেঘনার দূরত্ব ৫০ গজের মতো। পাশে বাঁধ না থাকায় প্রতিদিনই জোয়ারে ডুবছে তার ঘর। তার মতো হাজারো মানুষ কয়েক বছরে বসতভিটা, ফসলি জমি হারিয়ে হয়েছেন সর্বস্বান্ত।
কমলনগর উপজেলার ভাঙনকবলিত লুধুয়া বাজার এলাকার চিত্রও একই রকম। পুরনো ঘরের আসবাব আর স্বজনদের নিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে কয়েকটি পরিবার। বাজারের উত্তর পাশে নুরুজ্জামান মিঝিবাড়ি। এই বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরত্বে মেঘনা নদী। যেকোনো সময় গিলে খাবে আবুল খায়েরের বসতভিটা। তাই ৬০ বছরের পুরনো ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন নতুন বসতিতে। শৈশব, কৈশোর আর যৌবনের সব স্মৃতি মেঘনার বুকে ঢেলে যাচ্ছেন তিনি।
চোখে-মুখে কষ্টের ছাপ তার। সরিয়ে নেওয়া মালপত্র গাড়িতে বোঝাই করতে গিয়ে আবুল খায়ের বললেন, ‘১২ পরিবারের এই বাড়িটির নাম ছিল জয়নাল আবেদীন মিঝিবাড়ি। প্রায় ৬০ বছরের পুরনো বাড়ি এটি। শতাধিক লোকের বসবাস ছিল। এখন মাত্র দুটি ঘর ছাড়া বাকিগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন বাসিন্দারা। কারণ কয়েক একর ফসলি জমি, পুকুর, বাগান সব কেড়ে নিয়েছে মেঘনা। যেকোনো সময় আমার বাড়িটিও কেড়ে নিতে পারে। একে একে সব পরিবার সরে যাচ্ছে নদী থেকে নিরাপদ দূরত্বের ভূমিতে। আমি যাচ্ছি চরকাদিরায়।’
স্থানীয়দের হিসাবে, এ পর্যন্ত রামগতি ও কমলনগর উপজেলার অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২৮টি বাজারসহ বিস্তীর্ণ জনপদ বিলীন হয়েছে নদীতে। ভাঙনের কবলে বাস্তুহারা হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। হুমকিতে রয়েছে চারটি বাজারসহ আরও ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গত এক বছরের ভাঙনে দুই উপজেলার প্রায় দেড় হাজার পরিবার হারিয়েছে ঘরবাড়ি। বিলীন হয়েছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনাসহ কয়েকশ একর ফসলি জমি।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, ১৯৯৫ সাল থেকে শুরু হয়েছে মেঘনার ভাঙন। কয়েক দশকে কমলনগরের চরফলকন ইউনিয়নের ১০-১২ কিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়েছে নদীতে। ২০০৮ সাল থেকে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ভাঙন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইব্রাহিম খলিলের ভাষ্য, বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে। মেঘনা উপকূলের কয়েক লাখ মানুষ তাকিয়ে আছে বাঁধের দিকেই। অথচ এখনো অর্ধেকও শেষ হয়নি কাজ।
গত সাত বছরে রামগতি উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অন্তত সাত কিলোমিটার বিলীন হয়েছে মেঘনায়। নদীপাড়ের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত সময়ের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ না হলে বিলীন হতে পারে বেশ কয়েকটি গ্রাম।
স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে মেঘনাতীরে টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পের আওতায় রামগতির বড়খেরী থেকে উত্তরে কমলনগরের মতিরহাট পর্যন্ত ৩১ কিলোমিটার বাঁধ হওয়ার কথা। এর মধ্যে রামগতিতে ১৮ কিলোমিটার ও কমলনগরে ১৩ কিলোমিটার পড়েছে। জিওব্যাগ, ব্লক ফেলা ও মাটি ভরাটসহ ১০২টি প্যাকেজে কাজের ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। অথচ এখনো দৃশ্যমান হয়নি অর্ধেক কাজও।
তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তিনজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, ৯৭টি লটে দেওয়া হয়েছে প্রকল্পের কার্যাদেশ। এর মধ্যে ৩৫টি লটে কোনো কাজ হচ্ছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএসইসিএলের সাতটি লটে দু-তিন ভাগ, এডব্লিউআরের পাঁচটি লটে দুই ভাগ, বিশ্বাস বিল্ডার্সের ছয়টি লটে দুই ভাগ, ইলেকট্রো গ্রুপের একটি লটে পাঁচ ভাগ শেষ হওয়ার পর বন্ধ আছে প্রকল্পের কাজ। ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ১৫টি লটে প্রায় ৪০ ভাগ শেষ করলেও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে কাজ।
তবে কাজ দৃশ্যমান না হওয়ার তথ্য অস্বীকার করেন লক্ষ্মীপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ-উজ জামান খান। তার দাবি, অনেক স্থানে বাঁধ দৃশ্যমান। এখন কোথাও নেই ভাঙন। বছরে কাজের জন্য মাত্র কয়েক মাস সময় পাওয়া যায়। এ কারণে বেগ পেতে হচ্ছে কিছুটা।




