আয় বাড়াতে উল্টো ব্যয়ের বোঝা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আয় বাড়ানোর আশায় প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ করে প্ল্যান্ট বানিয়েছিল খুলনা ওয়াসা। উৎপাদনও শুরু হয়েছিল ঘটা করে। বাজারে ছাড়া হয়েছিল ‘সুন্দরবন পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার’ নামে বোতলজাত পানি। কিন্তু আয় বাড়ানোর সে উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে লোকসানের প্রকল্পে। ছয় বছরে প্ল্যান্টটি চালাতে খরচ হয়েছে ৩ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার ৪২১ টাকা। বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ১ কোটি ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩২ টাকা। অর্থাৎ আয় থেকে পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়েই লোকসান হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ৮৭ হাজার ৪৯ টাকা।
ধারাবাহিক এই লোকসানের কারণে শেষ পর্যন্ত গত জুলাইয়ে প্ল্যান্টটির উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে খুলনা ওয়াসা। এখন সেটি লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। তবে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি প্ল্যান্ট কেন কয়েক বছরেই লোকসানের বোঝায় পরিণত হলো, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
খুলনা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির রাজস্ব আয় বাড়াতে ২০১৬ সালে পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় বোতলজাত পানি উৎপাদনের প্ল্যান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারি অর্থায়নে ১৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের নভেম্বরে শুরু হয় নির্মাণকাজ। ২০১৯ সালের জুনে কাজ শেষ হলেও উৎপাদনে যেতে আরও এক বছরের বেশি সময় লাগে। ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্ল্যান্টটির আনুষ্ঠানিক উৎপাদন শুরু হয়।
‘সুন্দরবন পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার’ নামে ৩০০ মিলিলিটার, ৫০০ মিলিলিটার, ১ লিটার, ২ লিটার, ৩ লিটার ও ৫ লিটারের বোতলে পানি উৎপাদন করা হতো। প্রতি মাসে উৎপাদন হতো ১৮ হাজার ২৭২ লিটার। ফ্যাক্টরির গেট থেকে সরাসরি গ্রাহক ও ডিলারদের মাধ্যমে এসব পানি বিক্রি করা হতো।
কিন্তু উৎপাদনের শুরু থেকেই আয়-ব্যয়ের হিসাবে ছিল বড় ফারাক। ২০২০-২১ অর্থবছরে প্ল্যান্ট পরিচালনায় ব্যয় হয় ২৯ লাখ ৭ হাজার ৯৪৭ টাকা। বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় মাত্র ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩ লাখ ৯ হাজার ৪২৬ টাকায়। ওই বছর রাজস্ব আদায় হয় ১৩ লাখ ৮১ হাজার টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় হয় ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ১২৪ টাকা, বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয় ২৯ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।
এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্ল্যান্ট পরিচালনায় ব্যয় হয় সর্বোচ্চ ৭৬ লাখ ৩৫ হাজার ২৪৭ টাকা। ওই বছর রাজস্ব আদায় হয় ৩৪ লাখ ২৬ হাজার ৯৩২ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় হয় ৬৫ লাখ ৮৭ হাজার ৬১৭, রাজস্ব আদায় হয় ২৯ লাখ ২৮ হাজার ৬০৫ টাকা।
সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্ল্যান্ট পরিচালনায় ব্যয় হয়েছে ৫৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৯ টাকা। বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২১ লাখ ১৪ হাজার ৩২২ টাকা। ছয় বছরের হিসাব বলছে, কোনো অর্থবছরেই প্ল্যান্টটির পরিচালন ব্যয় উঠে আসেনি; বরং প্রতি বছরই লোকসান গুনেছে খুলনা ওয়াসা। সব মিলিয়ে ছয় বছরে ৩ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার ৪২১ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে আয় হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩২ টাকা। অর্থাৎ আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় আড়াই গুণ।
নিজের আয়েই টান, তার ওপর লোকসানের প্রকল্প: খুলনা ওয়াসার সামগ্রিক আর্থিক অবস্থাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর তাদের আয় প্রায় ১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাতেই ব্যয় হয় প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি টাকা। এমন আর্থিক বাস্তবতায় রাজস্ব বাড়ানোর বদলে একটি বড় বিনিয়োগের প্ল্যান্ট থেকে নিয়মিত লোকসান হওয়ায় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) খুলনার সভাপতি অধ্যাপক রমা রহমান বলেছেন, সঠিক মনিটরিং ও জবাবদিহির অভাবেই ওয়াসার প্ল্যান্ট পরিচালনায় অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার মতে, কাগজ-কলমে রাজস্ব আদায় কম এবং উৎপাদন খরচ বেশি দেখিয়ে অর্থ লুটপাট করা হয়ে থাকতে পারে। অথচ প্ল্যান্টটি লাভজনক করার জন্য সংশ্লিষ্টদের কার্যকর কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তাদের উদাসীনতায় জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে। প্ল্যান্টটি আবার চালু করে কীভাবে লাভজনক করা যায়, সে বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানালেন তিনি।
লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা ওয়াসার: খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ বলেছেন, প্ল্যান্টটি চালুর পর থেকেই অব্যবস্থাপনা ও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে লোকসানে রয়েছে। প্রতি বছর এ লোকসানের টাকা ওয়াসাকেই বহন করতে হয়েছে।
তার ভাষায়, ‘সংগত কারণেই আমি যোগদানের পর জুলাই থেকে প্ল্যান্টটির উৎপাদন বন্ধ রেখেছি। এটি লাভজনক করতে লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আজ ১০ আগস্ট ওয়াসার বোর্ড মিটিংয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
ফিরোজ শাহ বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে প্ল্যান্টটি লাভজনক হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু কেন এটি লোকসানের মুখে পড়েছে— তাও শনাক্ত করা হবে।




