ঈদ এলেও ফেরে না জিহাদ, অপেক্ষায় আজও একটি পরিবার

সংগৃহীত ছবি
‘জিহাদ বেঁচে থাকলে হয়তো আজ বাড়ি ফিরত। মা-বাবা আর ভাই-বোনদের পাশে বসে হাসিমুখে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিত। ঘর ভরে উঠত ওর প্রাণখোলা হাসিতে। এখন সেই জায়গাজুড়ে শুধুই নীরবতা আর অসীম শূন্যতা।’
কাঁপা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া শিক্ষার্থী জিহাদের বাবা নুরুল হক মোল্লা। ঈদ সামনে এলেই তাঁদের পরিবারে ফিরে আসে অসহনীয় বেদনা আর অপূরণীয় শূন্যতার অনুভূতি।
বুধবার (২৭ মে) নুরুল হক মোল্লার সঙ্গে কথা হলে ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর ভাষ্য, একসময় ঈদ ছিল তাঁদের পরিবারের সবচেয়ে আনন্দের সময়। কিন্তু এখন ঈদ মানেই বুকভরা হাহাকার।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দেশের রাজপথ ছিল উত্তাল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল রাজধানীজুড়ে। সেদিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার কৃতি সন্তান ও সরকারি কবি নজরুল কলেজের ইতিহাস বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী জিহাদ।
ছেলের স্মৃতিচারণ করে নুরুল হক মোল্লা জানান, ঈদ এলেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। জিহাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বই, জামাকাপড় আর হাসিমুখ সব সময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাঁর কথায়, ‘এখনো মনে হয়, এই বুঝি দরজা খুলে জিহাদ ঘরে ঢুকবে।’
তিনি আরও জানান, জিহাদ শুধু পরিবারের সন্তান ছিল না; সে ছিল তাঁদের স্বপ্ন, ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ। পরিবারের সবার কাছে অত্যন্ত আদরের ছিল সে। ভাই-বোনদের সঙ্গে তার ছিল গভীর সখ্য। ঈদের দিন জিহাদের হাসি-আনন্দে ঘরে অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হতো। এখন সেই ঘরটাই যেন নিঃশব্দ হয়ে গেছে।
শহীদ সন্তানের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে দিন কাটছে পরিবারটির। ঈদের কেনাকাটা, রান্নাবান্না কিংবা আত্মীয়-স্বজনের আনাগোনার মাঝেও অনুপস্থিত একজনের শূন্যতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, জিহাদের কথা মনে পড়লেই সবার চোখ ভিজে যায়।
স্থানীয়দের কাছেও জিহাদ ছিল ভদ্র, মেধাবী ও স্বপ্নবান এক তরুণ। পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজ ও দেশের নানা বিষয় নিয়েও সে সচেতন ছিল। পরিবারের আশা ছিল, একদিন জিহাদ বড় হয়ে তাঁদের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু রাজপথের রক্তাক্ত এক বিকেলে থেমে যায় সেই স্বপ্ন।
নুরুল হক মোল্লা বলেন, তাঁরা শুধু চান মানুষ যেন জিহাদকে মনে রাখে। তাঁর মতে, দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশ নিয়েই প্রাণ দিয়েছেন জিহাদ। একজন বাবা হিসেবে সন্তানের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে জিহাদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, এটাই পরিবারের প্রত্যাশা।
চারদিকে যখন ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে, তখন দশমিনার একটি বাড়িতে নেমে আসে গভীর নীরবতা। সেখানে আজও অপেক্ষায় থাকে একটি পরিবার; যে অপেক্ষার শেষ নেই, ফেরারও নেই কোনো সম্ভাবনা।






