যশোরে থামছে না খুনোখুনি
- ছয় মাসে ১৯ হত্যাকাণ্ড বিচারহীনতা উৎসাহ জোগাচ্ছে অপরাধে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যশোরে হত্যাকাণ্ডের ধরনে উদ্বেগজনক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ছুরি, চাপাতিসহ ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চলতি বছরের প্রথম সাড়ে ছয় মাসে জেলায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৯টি। এর মধ্যে অন্তত ৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে গলা কেটে।
পুলিশের ভাষ্য, এসব হত্যার পেছনে কাজ করেছে মাদক, পারিবারিক বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, আধিপত্য বিস্তার ও সামাজিক দ্বন্দ্ব।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এ উদ্বেগ আরও স্পষ্ট করেছে। গত বুধবার রাতে শহরের বারান্দিপাড়া এলাকায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন সিরাজুল ইসলামের ছেলে জিতু (৩৫)। অবশ্য তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ ১৪টি মামলা ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে জিতুর চাকুর আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন পূর্ব বারান্দি মাঠপাড়া এলাকার লাল মিয়ার স্ত্রী শুকরান বেগম (৫২) এবং তার ছেলে সুমন হোসেন ওরফে সুমন মিয়া (২৮)। তারা যশোর জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।
শুকরান বেগমের ভাষ্য, বুধবার রাতে জিতু তাদের বাড়ি এসে সুমনের কাছে চাঁদা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে ক্ষিপ্ত হয়ে সুমনকে কুপিয়ে জখম করে। ছেলেকে বাঁচাতে গেলে তাকেও কুপিয়ে জখম করা হয়।
একই মাসে জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘটেছে আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড। ৬ জুলাই বাঘারপাড়া উপজেলার খাজুরা ফুয়েল স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় রুবেল হোসেন (৩৮) নামে যুবদলের এক নেতাকে। ১৫ জুলাই ঝিকরগাছা উপজেলার বাউসা গ্রামের একটি ঝোপ থেকে সাখাওয়াত হোসেন সাকা (৬৩) নামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগে গত ২৪ জুন সদর উপজেলার রঘুরামপুর গ্রামে বাড়ির পাশ থেকে সাঈদ সরদার ওরফে চশমা সাঈদ (৩২) নামে এক যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর তিন দিন আগে ২১ জুন চৌগাছা উপজেলার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড়ের খালে ভাসমান অবস্থায় আতিয়ার রহমান (৪২) নামে এক বিএনপি কর্মীর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিহিংসার কারণেও একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ১১ জুন চৌগাছা উপজেলার মুক্তদহ গ্রামে স্ত্রীকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে যুবলীগ নেতা জুয়েল রানাকে (৩৫) কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষের লোকজন।
শুধু রাজনৈতিক বা মাদক-সংক্রান্ত বিরোধই নয়, সামান্য কারণে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে। ২২ এপ্রিল শহরের বেজপাড়া এলাকায় বকাঝকা করায় শাশুড়ি সকিনা বেগমকে (৬০) চাপাতি দিয়ে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে পুত্রবধূ মরিয়ম বেগমের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ৮ জুন সদর উপজেলার শেখহাটি তামালতলা এলাকায় বিয়ের ছয় মাসের মাথায় সামিনা আক্তার শাম্মীকে (২০) গলা কেটে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। একই রাতে মনিরামপুর উপজেলার শরমপুর গ্রামে নাতনিকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় ইমামুল হোসেন (৫০) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করে বখাটেরা।
যশোর পৌর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটুর ভাষায়, ‘পুলিশ এখনো পুরোপুরি জনআস্থা ফিরে পায়নি। অপরাধ দমনে রয়েছে সমন্বয়ের ঘাটতি, যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন।’
তবে পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ মানতে নারাজ। তার দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর বেশিরভাগই মাদক, চুরি, ইভ টিজিং বা ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে ঘটেছে; রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড নয়।
‘মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে চালানো হচ্ছে সচেতনতামূলক কর্মসূচি’— বলেছেন তিনি।




