বিকাল হলেই রাধানগরে জমে ‘আলী ভাইয়ের ঝালমুড়ির’ আড্ডা

শ্রীমঙ্গলের রাধানগরে জমে আলীর ঝালমুড়ির দোকান— আগামীর সময়
ভোরের আলো ফুটতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের পর্যটনসমৃদ্ধ রাধানগর গ্রাম। সড়কের পাশে ছোট্ট একটি খাবারের দোকান ঘিরে সকাল থেকেই দেখা যায় মানুষের আনাগোনা। কারও হাতে গরম খিচুড়ির প্লেট, কেউ অপেক্ষা করছেন ডিম মামলেট ও চায়ের জন্য। আর বিকাল গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্য তখন জমে ওঠে আলী ভাইয়ের বিশেষ ঝালমুড়ির আড্ডা।
শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামের ‘আলী স্টোর অ্যান্ড টি স্টল’ স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক, সিএনজি অটোরিকশা চালক, ঢেলাগাড়ি চালক, জিপচালক, লেবু-আনারস বিক্রেতা ও পথচারীদের কাছে পরিচিত একটি খাবারের দোকান। সপ্তাহের সাত দিনই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাধানগর ও আশপাশের এলাকার কৃষকেরা প্রতিদিন সড়কের পাশে টাটকা লেবু, কাঁঠাল, আনারসসহ বিভিন্ন ফল বিক্রি করতে আসেন শহরে। এসব ফল বিক্রি করতে আসা মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী, পর্যটক ও বাসিন্দাদের অনেকেই সকালের নাশতা কিংবা চায়ের জন্য ভিড় করেন আলী স্টোরে।
দোকানটির সবচেয়ে জনপ্রিয় খাবার সকালের গরম খিচুড়ি। খিচুড়ির সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ছোলা, ডাল, আলুর চপ, বেগুনি ও পেঁয়াজু। পাশাপাশি পরোটা, সবজি ও চায়েরও রয়েছে বেশ চাহিদা। তবে বিকালে দোকানটির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে ঝালমুড়ি। বিশেষ করে ‘আলী ভাইয়ের ঝালমুড়ি’ খেতে স্থানীয় তরুণদের পাশাপাশি পর্যটকদেরও ভিড় করতে দেখা যায়।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে দোকানটিতে গিয়ে দেখা যায়, এক পাশে গরম তেলে আলুর চপ, পেঁয়াজু, পুরি ও সিঙাড়া ভাজা হচ্ছে। অন্য পাশে কয়েকটি দলে বসে ঝালমুড়ি খাচ্ছেন তরুণ ও পর্যটকেরা। কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের জন্য খাবার কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
দোকানের কর্মী ইকবাল হোসেন বললেন, ‘প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন। সকালে গরম খিচুড়ি এবং বিকালে ঝালমুড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে নাস্তা করতে আসেন। দিনে গড়ে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কাপ চা বিক্রি হয় বলেও জানান তিনি।
দোকানের বাবুর্চি আবজল শেখ বলেছেন, ‘তাদের প্রধান দুটি খাবার হলো খিচুড়ি ও ঝালমুড়ি। অনেকের কাছে এখানকার ঝালমুড়ি ‘ছোলা-পেঁয়াজু’ নামেও পরিচিত। সাধারণ এক প্লেটের দাম ৩০ টাকা। ডিম, পুরি, আলুর চপ ও পেঁয়াজু যোগ করলে দাম পড়ে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এর সঙ্গে দেওয়া হয় নাগা মরিচ, কাঁচা মরিচ ও সালাদ। প্রতিদিন বিকেলে প্রায় ২০ থেকে ৩০ কেজি ছোলা রান্না করা হয়।
চট্টগ্রাম থেকে শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা পর্যটক মো. রাব্বি খান বলছেন, ‘শ্রীমঙ্গলে এসে রাধানগরের এই দোকানের কথা জানতে পারেন। এরপর সকালে খিচুড়ি ও বিকালে ঝালমুড়ি দুটিই খেয়ে দেখেছেন।এখানকার খাবারের স্বাদ অন্যরকম এবং বেশ ভালো লেগেছে।’
রাঙ্গামাটি থেকে আসা লেডিস বাইকার উম্মে নাফিজা সুলতানা ইমা বলেন, ‘অনেক জায়গা ঘুরে রাধানগরের একটি রিসোর্টে উঠেছেন। সেখান থেকে জানালার পাশ দিয়ে একটি ছোট চায়ের দোকানে অনেক মানুষের ভিড় দেখতে পান। পরে সেখানে গিয়ে দেখেন, এক পাশে আগুন জ্বালিয়ে গরম তেলে ভাজাপোড়া খাবার তৈরি করা হচ্ছে। পরে তারা ঝালমুড়ি ও জুস খেয়ে দেখেন। তার কাছে আলী স্টোরের খাবারের স্বাদ ভালো লেগেছে এবং দোকানের ব্যবহারও ভালো লেগেছে। শ্রীমঙ্গলে আবার এলে তিনি এখানে খেতে আসবেন বলেও জানান।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় রাধানগরের আশপাশে বড় কোনো বাজার বা খাবারের দোকান ছিল না। সময়ের সঙ্গে এলাকায় দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও আলী স্টোরের জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং দীর্ঘদিনের পরিচিতি ও খাবারের স্বাদের কারণে পুরোনো ক্রেতাদের পাশাপাশি নতুন ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে।
আলী স্টোর অ্যান্ড টি স্টলের স্বত্বাধিকারী মো. আলী বলেছেন, ‘তার বাবা তার নামেই আগে দোকানটি পরিচালনা করতেন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি বর্তমানে ‘আলী স্টোর অ্যান্ড টি স্টল’ নামে ব্যবসাটি চালিয়ে যাচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন সবকিছু মিলিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বিক্রি হয়। পর্যটকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে খেতে আসেন। এই দোকানই আমার পরিবারের প্রধান ভরসা। দোকানের আয় দিয়েই সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাই। সবসময় খাবারের স্বাদ ও মান ঠিক রাখার চেষ্টা করি।’








