কালীগঞ্জ
দাবদাহের শহরে স্বস্তির দূত তালের শাঁস

জ্যৈষ্ঠের দুপুর। মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য, রাস্তাঘাট যেন উত্তপ্ত চুল্লি। এমন দম বন্ধ করা গরমে একটু প্রশান্তির খোঁজে মানুষ ছুটছে প্রকৃতির সহজলভ্য এক উপহারের দিকে-তালের শাঁস।
গাজীপুরের কালীগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক, বাজার ও মোড়ে এখন চোখে পড়ছে তালের শাঁসের ছোট ছোট অস্থায়ী দোকান। স্বচ্ছ সাদা রঙের এই মৌসুমি ফলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন রকমের ব্যস্ততা। সকাল গড়াতেই বিক্রেতাদের সামনে ভিড় জমাচ্ছেন পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর ও পরিবারের সদস্যরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে উপজেলার বাজার বাসস্ট্যান্ড , বক্তারপুর, জামালপুর, নাগরী, বাশাইর, তুমলিয়া, জাঙ্গালিয়া, মোক্তারপুরসহ কালীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার পাশে সারি সারি করে সাজানো রয়েছে তাল। দক্ষ হাতে সেগুলো কেটে বের করা হচ্ছে নরম ও রসালো শাঁস। ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে গরমে স্বস্তি এনে দেওয়া এই প্রাকৃতিক খাবার।
উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ভাদার্ত্তী এলাকার পাইকারি তাল বিক্রেতা এবাদুল্লাহ (৪০) জানালেন, এ বছর প্রচণ্ড গরমের কারণে বিক্রি অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। প্রতিটি শাঁস ২০ টাকা করে বিক্রি হলেও একসঙ্গে বেশি নিলে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। একটি তাল থেকে সাধারণত তিন থেকে চারটি শাঁস পাওয়া যায়। অনেক দিন এমন বিক্রি দেখিনি। প্রতিদিন প্রায় চার শতাধিক শাঁস বিক্রি করতে পারছি।
শুধু বিক্রেতারাই নন, ক্রেতারাও বেশ আগ্রহ নিয়ে কিনছেন মৌসুমি এই ফল। বক্তারপুর গ্রামের বাসিন্দা সুমন প্রধানের ভাষ্য, বাচ্চারা তালের শাঁস খুব পছন্দ করে। গরমে এটি খেতেও ভালো লাগে। বছরের অল্প কিছু সময় পাওয়া যায় বলেই সুযোগ পেলেই কিনে নিয়ে যাই।
কালীগঞ্জ পৌরসভার চৌড়া এলাকার খুচরা তাল শাঁস বিক্রেতা রফিক মিয়ার ভাষ্য, গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তালের শাঁসের চাহিদাও বেড়েছে। বাজারে এখন এটি অন্যতম জনপ্রিয় মৌসুমি খাদ্যে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু স্বাদ নয়, পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ তালের শাঁস। ডাবের পানির মতো এতে রয়েছে শরীরকে সতেজ রাখার বিভিন্ন উপাদান। পাশাপাশি হজমশক্তি বাড়াতেও এটি সহায়ক।
শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মুনমুন শিসেলী ঘোষের মতে, প্রচণ্ড গরমে তালের শাঁস শরীরকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। এতে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান হজমে সহায়ক এবং শরীরে স্বস্তি এনে দেয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদী বললেন, বাণিজ্যিকভাবে এই অঞ্চলে তাল গাছের তেমন বাগান নেই। সাধারণত বসত বাড়ি বা রাস্তার পাশে মানুষ তালগাছ রোপণ করে থাকে। তালগাছ লম্বা হওয়ার কারণে বজ্রপাত রোধে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাতাসের গতি রোধ করে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
একসময় গ্রামের আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছকে অনেকেই কেবল ছায়া বা কাঠের উৎস হিসেবে দেখতেন। কিন্তু জ্যৈষ্ঠের এই তীব্র দাবদাহে সেই তালগাছের ফলই এখন হয়ে উঠেছে মানুষের প্রশান্তির এক সহজ ও জনপ্রিয় আশ্রয়। গরম যত বাড়ছে, তালের শাঁসের প্রতি মানুষের আগ্রহও ততই বাড়ছে।





