ফসলের মাঠে পুকুরের রাজত্ব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কৃষিজমি রক্ষায় আইন ও সরকারি নির্দেশনা থাকলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উর্বর জমি পরিণত হচ্ছে পুকুর ও মাছের ঘেরে। নাটোরের গুরুদাসপুর এবং শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের সাম্প্রতিক চিত্র সেই বাস্তবতাকেই নিয়ে এসেছে সামনে। প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অব্যাহত রয়েছে কৃষিজমি খনন। এতে কমছে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্র, বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ ভূপ্রকৃতি এবং বাড়ছে কৃষকের উদ্বেগ।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার কাছিকাটা টোলপ্লাজার পাশের বিস্তীর্ণ মাঠে একসময় মৌসুম জুড়ে আবাদ হতো ধান, পাট, সরিষা ও সবজি। এখন সেই জমির বড় অংশ জুড়ে চলছে পুকুর খনন।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে পুকুর খননের কারণে গুরুদাসপুরে প্রায় ১২০ হেক্টর দুই ও তিন ফসলি জমি কমে গেছে। এর ফলে বছরে কমেছে প্রায় ১০০ টন ধান উৎপাদন। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের হিসাবে, এই ক্ষতির আর্থিক মূল্য দেড় থেকে ২ কোটি টাকা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নানা পয়েন্টে এক্সক্যাভেটর দিয়ে চলছে মাটি কাটা। প্রশাসনের অভিযানে যন্ত্র জব্দ বা ব্যাটারি খুলে নেওয়ার পরও কয়েক দিনের মধ্যেই আবার শুরু হচ্ছে খননকাজ। একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে তিন ফসলি জমি কেটে তৈরি করা হচ্ছে মাছের ঘের ও পুকুর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকদের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, কোথাও কোথাও চাপ প্রয়োগেরও অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে মাছ উৎপাদনে অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। বাণিজ্যিক মাছচাষ গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি পুকুরে রূপান্তর করলে
দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার ওপর তৈরি হতে পারে চাপ।
ভেদরগঞ্জ কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ২ থেকে ৩ শতাংশ হারে কমছে কৃষিজমি। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, পুকুর খননের কারণে অনেক এলাকায় নষ্ট হচ্ছে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা। কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, আবার কোথাও দেখা দিচ্ছে সেচ ব্যবস্থায় সমস্যা।
উপজেলার মহিষার ইউনিয়নের কৃষক লিটন মিয়া বললেন, ‘যেখানে ধান হতো, সেখানে এখন মাছের ঘের। অনেক কৃষক জমি দিতে চান না, কিন্তু বিভিন্নভাবে পড়েন চাপের মুখে।’
আরেক কৃষক আবু বক্করের অভিযোগ, তার জমির পাশেই পুকুর খনন হওয়ায় চাষাবাদ পড়েছে ঝুঁকির মুখে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য থাকবে না কৃষিজমি।’
গুরুদাসপুরে কৃষিজমি খননের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মাটি বাণিজ্য। উপজেলায় একাধিক ইটভাটা রয়েছে, যেগুলোর নবায়ন মেয়াদ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব ভাটায় কাঁচা ইট তৈরির জন্য বিপুল পরিমাণ মাটির প্রয়োজন। সেই চাহিদা পূরণে গড়ে উঠেছে মাটি ব্যবসায়ী চক্র।
কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি কেটে ট্রাক্টর ও ডাম্প ট্রাকে সরবরাহ করা হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এতে জমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়কও।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, রাতভর মাটি বহনকারী যানবাহন চলাচলে সড়ক ভেঙে যাচ্ছে, বাড়ছে ধুলোবালি ও শব্দদূষণ। কিন্তু লাভজনক এই ব্যবসা থামাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দেখা যাচ্ছে না।
দুই উপজেলায়ই প্রশাসন নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি করছে। গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ জানিয়েছেন, দেড় মাসে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে অন্তত ১৫টি। জব্দ করা হয়েছে একাধিক খননযন্ত্র।
ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, কোথাও পুকুর বা জলাশয় খনন করতে হলে নিতে হয় উপজেলা প্রশাসনের অনুমতি। ইটভাটা করতে গেলেও উপজেলা প্রশাসনের অনুমোদন লাগে। তবে এসব নিয়মকানুন অনুসরণ না করেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে খনন হচ্ছে পুকুর।
‘কৃষিজমিতে পুকুর খনন বেআইনি। অভিযোগ পেলে দ্রুত নেওয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা’— বললেন ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুল হক।




