মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল
পর্দার আড়ালে ২০ লাখের কারসাজি
- ৫-৭ লাখ টাকার পর্দায় খরচ দেখানো হয়েছে ২০ লাখ
- টেন্ডার পাওয়া ঠিকাদারকে দেওয়া হয়নি পুরো কাজ

মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল
চিকিৎসক, ওষুধ ও জনবলসংকটে থাকা মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নতুন ভবনের জন্য পর্দা কেনায় ব্যয় দেখানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা। অথচ হাসপাতালের পুরো ভবনে থাকা ৫৫০-৬০০টি পর্দার স্থানীয় বাজারমূল্য, ফিটিংস, মিস্ত্রির খরচসহ মোট ব্যয় সর্বোচ্চ ৭ লাখ টাকার মধ্যে থাকার কথা বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। আরও অভিযোগ রয়েছে, ৩৫ লাখ টাকার ওসিসি ও স্টেশনারি সামগ্রী সরবরাহের কাজ পাওয়া ঠিকাদারের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে বাকি ২৬ লাখ টাকার সামগ্রী কেনা হয়েছে অন্য মাধ্যমে। এর মধ্যে পর্দা কেনার হিসাব দেখানো হয়েছে ২০ লাখ টাকা।
হাসপাতালের ক্রয়-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওসিসি ও স্টেশনারি খাতে ৩৫ লাখ টাকার সামগ্রী সরবরাহের কাজ পায় মেহেরপুর ট্রেডিং নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে অর্থবছর শেষ হওয়ার পরও ওই প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া হয়েছে দুই দফায় মাত্র ৯ লাখ টাকার সামগ্রী। বাকি ২৬ লাখ টাকার সামগ্রী কেনা হয়নি ওই ঠিকাদারের কাছ থেকে। যার মধ্যে বড় অঙ্কের ব্যয় দেখানো হয়েছে পর্দা কেনায়। এজন্য চার সদস্যের একটি ক্রয় কমিটিও করা হয়। কমিটিতে ছিলেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবীর, ডা. আবুল কাশেম, ডা. আমেনা খাতুন ও ডা. হাসিবুল ইসলাম।
তবে পর্দার প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।। হাসপাতালের পুরো ভবনে ৫৫০-৬০০টি পর্দা থাকার হিসাব পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেনা পর্দাগুলোর স্থানীয় বাজারমূল্য প্রতিটি সর্বোচ্চ ৫০০-৬০০ টাকা হতে পারে। সে হিসাবে ৬০০টি পর্দার দাম দাঁড়ায় প্রায় ৩ থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে পাইপ, ফিটিংস ও মিস্ত্রির খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় ৭ লাখ টাকার মধ্যে থাকার কথা বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। হাসপাতালের প্রধান সহকারী ও স্টোরকিপার কতটি পর্দা কেনা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট হিসাব দিতে পারেননি।
তবে পর্দা কেনার পুরো প্রক্রিয়াটি তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক নিজে করেননি— এমন দাবি করেছেন হাসপাতালের স্টোরকিপার পলিয়ারা খাতুন। তিনি বলেছেন, ‘সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবীর নতুন ভবনের জন্য ২০ লাখ টাকার পর্দা কিনেছেন। প্রধান সহকারী আসাদুল ইসলাম লিটন বিল তৈরি করে দিয়েছেন। তিনি শুধু স্টোরকিপার হিসেবে মালামাল বুঝে নিয়েছেন।’ কোন ঠিকাদারের কাছ থেকে পর্দা কেনা হয়েছে, তা তিনি জানেন না বলেও দাবি করেন।
পর্দার পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তার বক্তব্যও ছিল অস্পষ্ট। এত টাকার পর্দা আসলেই প্রয়োজন হয়েছিল কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘আমি কি এ কথা বলতে পারি?’
হাসপাতালের প্রধান সহকারী আসাদুল ইসলাম লিটনের ভাষ্য, ‘হাসপাতালের ‘বস’ হচ্ছেন তত্ত্বাবধায়ক। তিনি যেভাবে নির্দেশনা দেন, অধীনস্থ হিসেবে আমরা সেভাবেই কাজটি করি।’ তার দাবি, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবীর ২০ লাখ টাকার পর্দা কিনেছেন। টেন্ডার পাওয়া ঠিকাদারের কাছ থেকে না কিনে অন্য ঠিকাদারের কাছ থেকে কেনা হলো কেন— এমন প্রশ্নে তার জবাব, ‘তত্ত্বাবধায়ক স্পট কোটেশনের মাধ্যমে পর্দা কিনেছেন। আমরা শুধু নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছি।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি পর্দার দাম ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। তবে তিনি পর্দা কেনার ভাউচার দেখাতে রাজি হননি।
মেহেরপুর ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী দেবাশীষ বাগচির দাবি, ই-জিপির মাধ্যমে পাওয়া কাজ অন্য কোনো ঠিকাদার করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওসিসি ও স্টেশনারি খাতে ৩৫ লাখ টাকার কাজ তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠান থেকে দুই দফায় মাত্র ৯ লাখ টাকার সামগ্রী নেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬ লাখ টাকার মালামাল নেওয়া হয়নি।’
তবে হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. বুলবুল কবীর অভিযোগটি ব্যাখ্যা করেছেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেছেন, ‘স্টেশনারি সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রে উপযোজন প্রক্রিয়ায় ক্রয় কমিটি করে কেনা হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় নতুন ভবনের পর্দাও কেনা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নথি হাসপাতালে রয়েছে।’
তার ভাষ্য, তিনি শুধু প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছেন। গত ১১ নভেম্বর মেহেরপুর হাসপাতালে যোগ দিয়ে প্রায় তিন মাস সেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন। পর্দা কেনার বিলের চেক বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক স্বাক্ষর করেছেন। হিসাব সঠিকভাবে যাচাই করলে সব হিসাব মিলে যাবে।
তার বক্তব্যের বিষয়ে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. সাজ্জাদ হাসানের মন্তব্য, আগের তত্ত্বাবধায়ক এসব কেনাকাটা করেছেন। এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।






