শরবত বিক্রি করে স্বপ্নের পথে শারীরিক প্রতিবন্ধী রানা

শরবত বিক্রি করছেন রানা
এক পা খুঁড়িয়ে হাঁটেন রানা মিয়া। অন্য হাতটিও স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করতে পারেন না। ভারী কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ে ব্যথা হয়, রগে টান ধরে। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতা তার চলার পথ কঠিন করে তুললেও থামাতে পারেনি পড়াশোনা। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে শরবত বিক্রি করেন তিনি। কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজের গণিত বিভাগের প্রথম বর্ষের এই শিক্ষার্থী প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলেছেন স্বপ্নপূরণের পথে।
কিশোরগঞ্জ জজকোর্টের সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভবনের সামনে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত শরবত বিক্রি করেন রানা। প্রতি গ্লাস শরবতের দাম ১০ টাকা।
তার দাবি, প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকার শরবত বিক্রি হয়। লেবু, চিনি, পানি, বরফসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা থাকে তার। সপ্তাহে পাঁচ দিন শরবত বিক্রি করেন তিনি। এই আয় দিয়েই নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারকে সহযোগিতা করেন।
রানা মিয়ার বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলের সিংরইল ইউনিয়নের উত্তর কচুরী গ্রামে। তার বাবা হারিছ মিয়া (৫৫) কৃষক এবং মা গৃহিণী। চার সদস্যের পরিবারটির সংসার চলে সীমিত আয়ে। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে বাবাও আগের মতো কাজ করতে পারেন না। ফলে ছেলের উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
নান্দাইল উপজেলার বাকচান্দা আব্দুস সামাদ একাডেমি থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৪.৭৮ এবং কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৪.০৮ অর্জন করেন তিনি।
রানা মিয়া বললেন, ‘ক্লাস নাইনে পড়ার সময় অর্থের অভাবে প্রাইভেট পড়া ছেড়ে দিই। এরপর ইউটিউব ও অনলাইনে বিভিন্ন ক্লাস দেখে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি।’
নিজের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে রানা বলেন, ‘জন্ম থেকেই আমার পা ও হাতে সমস্যা। ভারী কোনো কাজ করতে পারি না। অনার্সে ভর্তি হওয়ার পর পড়াশোনার খরচ বেড়ে গেছে। এখন শরবত বিক্রি করে কোনোভাবে খেয়ে না-খেয়ে দিন পার করছি। দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে শরবত বিক্রি করায় পায়ে ব্যথা হয়, রগ টানে। খুব কষ্ট হয়। ভাই, যদি ঠিকমতো এক বছর পড়াশোনা করতে পারতাম, তাহলে টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারতাম।’
ফার্মেসিতে ডেকে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ‘জামায়াতকর্মীর’ বিরুদ্ধে
২৩ আগস্ট ২০২৬
গুরুদয়াল সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল হাসান বললেন, ‘রানা মিয়া শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে জীবনযাপন করছে। নিজের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বকে জয় করে সে নিয়মিত ক্লাস করছে এবং পড়াশোনায়ও ভালো করছে। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের প্রমাণ। এমন একজন শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করা সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের দায়িত্ব বলেও আমি মনে করি।’
রানার বাবা হারিছ মিয়া বলেছেন, ‘কৃষিকাজ করে এবং মানুষের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে অনেক কষ্টে দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছি। এখন বয়স হয়েছে, শ্বাসকষ্টসহ শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। আগের মতো কাজ করতে পারি না। বড় ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও শরবত বিক্রি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছে। ছোট ছেলেকেও টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়াতে পারছি না। খুব কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে। আমাদের ঘরের অবস্থাও ভালো না, বৃষ্টির সময় ঘরের ভেতর পানি পড়ে।’
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, ‘রানার পড়াশোনায় যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’







