ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত মাদারীপুর

সংগৃহীত ছবি
তীব্র গরমে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। মাদারীপুরের শহর ও গ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায়ীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেশি। কখন বিদ্যুৎ আসবে কিংবা কখন চলে যাবে, তার নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি না থাকায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে মানুষের।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, লোডশেডিংয়ের কারণে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে পড়ার টেবিলে বসাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের যেসব শিক্ষার্থী দিনের বেলায় পরিবারের কাজ কিংবা কৃষিকাজে সহযোগিতা করে, তাদের পড়াশোনার প্রধান সময় রাত। কিন্তু সেই সময়েও বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের মাদ্রা গ্রামের শিক্ষার্থী রাবেয়া আক্তার বলেছেন, ‘অনার্সে ভালো ফলাফল করতে হলে অনেক পড়াশোনা করতে হবে। কিন্তু বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়তে পারছি না। গরমেও খুব কষ্ট হচ্ছে। রাত-দিন মিলিয়ে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা বিপদে আছি।’
একই গ্রামের শিক্ষার্থী রহিমা আক্তার বলেছেন, ‘আমাদের গ্রামে দিন-রাত মিলিয়ে এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। এভাবে বিদ্যুৎ না থাকলে আমরা কীভাবে পড়ালেখা করব?’
শিক্ষার্থী রাহাত হোসেনের ভাষ্য, ‘ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে রাতে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে প্রচণ্ড গরমে বসে থাকাও যায় না।’
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা ও কারিগরি কাজেও। মাদারীপুর পৌর শহরের ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি হায়দার সরদার বললেন, ‘সকালে কাজ শুরু করার পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। দুই ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এলেও ততক্ষণ কাজ বন্ধ থাকে। ফলে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না।’
প্রিন্ট ও ছাপাখানার মালিক অলিউল আহসান কাজল জানান, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক কাজ জমে আছে। এভাবে চলায় কয়েক দিনে ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হবে।’
মাদ্রা উচ্চবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ কাজী ওবায়দুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতিও ব্যাহত হচ্ছে।
আলীনগর ইউনিয়নের রাজারচর এলাকার অনার্স পড়ুয়া আয়েশা, শীলা রানী, কবিতা, সাইফুল ইসলাম, হোসেন মোল্লা ও সিনথিয়া খাতুন জানান, পড়তে বসলেই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। কখনো আধা ঘণ্টা, কখনো এক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসে। এতে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের ওপরও। নিয়মিত ব্যাটারি চার্জ দিতে না পারায় অনেক চালক নির্ধারিত সময়ে রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারছেন না। এতে কমে যাচ্ছে তাদের দৈনিক আয়। বিদ্যুৎনির্ভর ক্ষুদ্র ব্যবসা ও ফ্রিল্যান্সিংয়েও একই চিত্র। ফ্রিল্যান্সার শাহরিয়ার ও শুভ বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকলে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটভিত্তিক কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে কাজের সময়ের পাশাপাশি আয়ও কমে যাবে।’
লোডশেডিংয়ে স্থবিরতা নেমেছে নারী উদ্যোক্তাদের কাজেও। নারী উদ্যোক্তা শিউলি আক্তার বলেছেন, ‘প্রায় ২০ জন নারীকে নিয়ে বুটিকসের কাজ করি। এই কাজের আয় দিয়েই তাদের সংসার চলে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবাইকে বসে থাকতে হচ্ছে।’
শুধু কর্মক্ষেত্রেই নয়, ঘরেও স্বস্তি নেই মানুষের। শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা রাসেল বললেন, ‘সারাদিনের কাজ শেষে বাসায় ফিরে একটু স্বস্তি পাওয়ার সুযোগ নেই। দিন ও মধ্যরাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমে অস্বস্তির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।’
অতিরিক্ত গরম ও বিদ্যুৎহীনতার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। মাদারীপুর সদর হাসপাতালের আরএমও অখিল সরকার বললেন, অতিরিক্ত গরমে শিশুদের বিভিন্ন ধরনের ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বয়স্কদের উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা বাড়তে পারে। অতিরিক্ত গরমে হৃদ্রোগের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুৎ বিতরণ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১১ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে, মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের জন্য চাহিদা প্রায় ১০৬ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৫২ মেগাওয়াট। ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনায় নিয়ে লোডশেডিং বণ্টন করা হচ্ছে।
তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আরেক হিসাবে, জেলার পাঁচ উপজেলায় প্রায় সাড়ে চার লাখ গ্রাহকের বিপরীতে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৮৮ মেগাওয়াট। সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। ফলে দৈনিক গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে।
মাদারীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার সুশান্ত রায় বললেন, ‘এপ্রিলের শুরু থেকেই তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। অফিস, প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে আগের তুলনায় চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।’ তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি তিনি।





