চালুর ৩ দিনেই বন্ধ যশোর-খুলনা মহাসড়কের ওজন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, সচল হয়নি ৫ বছরেও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যশোর-খুলনা মহাসড়কে অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয় ওজন নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা ওয়ে স্কেল। অভয়নগরের চেঙ্গুটিয়ায় দেড় কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে স্থাপিত যন্ত্রটি চালুর তিন দিনের মাথায় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এটি আর সচল হয়নি। এতে একদিকে পড়ে রয়েছে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো, অন্যদিকে মহাসড়কে চলছে অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহন।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সড়কে ওভারলোড বন্ধের জন্য ওজন স্কেল স্থাপন করা হয়; কিন্তু চালু হওয়ার কিছুদিন পর স্থানীয় লোকজন ও পরিবহন শ্রমিকরা আপত্তি জানালে সেটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে অভয়নগর উপজেলার চেঙ্গুটিয়ায় ১২ দশমিক ৪৭ কাঠা জমির ওপর ওয়ে স্কেলটি নির্মাণ করা হয়। এতে ব্যয় হয় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। কংক্রিট অ্যান্ড স্টিল টেকনোলজিস লিমিটেড কেন্দ্রটি নির্মাণ করে। স্কেল পরিচালনার জন্য ১০ জন কর্মচারীর উপযোগী তিন কক্ষের একটি ভবনও তৈরি করা হয়।
কেন্দ্রটির উদ্দেশ্য ছিল, নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত পণ্য নিয়ে ট্রাক ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করছে কি না, তা ওজনের মাধ্যমে শনাক্ত করা এবং নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু চালুর পরপরই বাধার মুখে পড়ে উদ্যোগটি। ২০২২ সালের ১৭ মার্চ কেন্দ্রটি চালু করা হয়। মাত্র দুদিন পর, ১৯ মার্চ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন শ্রমিকদের আপত্তির মুখে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
সওজের সহকারী প্রকৌশলী সোহেল মিজানের ভাষায়, ওয়ে স্কেল চালুর পর স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মোটরশ্রমিকের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে এটি বন্ধ করে দেয়। এ সময় ব্যানার ও সাইনবোর্ড ভাঙচুর এবং কর্মচারীদের হেনস্তা করা হয়। পরে প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দেওয়া হয়। সেখান থেকে চালুর নির্দেশনা এলেও পরিস্থিতির কারণে আর চালু করা সম্ভব হয়নি।
এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রটি সচল করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহনের ওজন পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মিত স্থাপনাটি কার্যত কোনো কাজে আসছে না।
ওয়ে স্কেল বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সওজ কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি ওজন নিয়ে ট্রাক চলাচল করায় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে রাটিং ও খানাখন্দ তৈরি হচ্ছে। (সড়কের যে অংশের ওপর দিয়ে বেশির ভাগ যানবাহনের চাকা যায়, সেখানে চাকার আকৃতির সমান বা তার চেয়ে বেশি অংশ সমান্তরালে দেবে যাওয়ার ঘটনাকে প্রকৌশলীদের ভাষায় রাটিং বলা হয়। সাধারণত সড়কে নিম্নমানের বিটুমিন কিংবা সঠিক নিয়মে উপকরণ ব্যবহার না করলে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়)। ৩০ টন ধারণক্ষমতার সড়কে কোনো কোনো যানবাহনে ৫০ টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ যশোর-খুলনা মহাসড়ক। নওয়াপাড়া নদীবন্দর থেকে সার, খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিবহনে এ সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে অতিরিক্ত ওজনের যানবাহনের চাপ শুধু সড়কের স্থায়িত্বের জন্যই ঝুঁকি সৃষ্টি করছে না, পণ্য পরিবহনের এ গুরুত্বপূর্ণ পথের রক্ষণাবেক্ষণেও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। সড়কটির বিভিন্ন অংশের ক্ষয়ক্ষতি ও সংস্কারকাজের মধ্যে বর্তমানে ১৬ কিলোমিটার অংশে ঢালাইয়ের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সওজ কর্মকর্তারা। এ অবস্থায় অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে সড়কের স্থায়িত্ব রক্ষা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে মনে করেন তারা।
ওয়ে স্কেল চালুর বিষয়ে পরিবহন শ্রমিকদেরও আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন নওয়াপাড়া মোটরশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. রবিউল হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘ওয়ে স্কেল চালু হোক, এটা আমরাও চাই। তবে শুধু নওয়াপাড়ায় নয়, বাংলাদেশের সব জায়গায় এ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।’
অন্যদিকে সওজ কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি নির্দেশনা পেলে কেন্দ্রটি আবার চালু করা হবে। যশোর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) শাম্মী সুলতানার ভাষ্য, নওয়াপাড়ায় ওয়ে স্কেলটি ২০২২ সালের ১৭ মার্চ চালু করা হয়েছিল। ১৯ মার্চ বন্ধ করে দিতে হয়। সরকারি নির্দেশনা পেলে আবার চালু করা হবে।
তবে শুধু নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকলে কেন্দ্রটি কবে চালু হবে, তা অনিশ্চিতই থেকে যাচ্ছে। প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি সচল করা এবং মহাসড়কে অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া— দুটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।



