নামেই প্রথম শ্রেণির, কাজে ‘ঠনঠন’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌরসভার একটি পাবনা। ১৯৮৯ সাল থেকেই পেয়েছে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা। কাগজে-কলমে পরিচয়টি গৌরবের হলেও বাস্তবের পাবনা পৌরসভা তাল মেলাতে পারেনি সেই মর্যাদার সঙ্গে। পরিচ্ছন্ন সড়ক, কার্যকর ড্রেনেজ, পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা নিরাপদ নগর অবকাঠামো এবং আধুনিক নগর জীবনের মৌলিক সুবিধাগুলোর বেশিরভাগই রয়ে গেছে অধরা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট, জলাবদ্ধতা ও নাগরিক সেবার ঘাটতিতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে প্রায় তিন লাখ বাসিন্দাকে।
নগরবাসীর ভাষায়, পৌরসভা আছে, কিন্তু তার কার্যকারিতা যেন ‘কর্মহীন এক শবদেহ’। সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব— বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
পৌরসভার তথ্য বলছে, ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পৌরসভার আয়তন ২৭ দশমিক ২০ বর্গকিলোমিটার। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, প্রায় তিন লাখ মানুষের পৌরসভার জন্য দেড় শতাব্দীতেও নেওয়া হয়নি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা। ফলে কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় বাজার, কোথায় পরিবহন টার্মিনাল কিংবা কীভাবে সড়ক সম্প্রসারণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে— এসব বিষয়ে নেই পরিকল্পিত কোনো দিকনির্দেশনা।
যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে নগরের অবকাঠামো নির্মাণে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠছে বহুতল ভবন ও বিপণিবিতান। অনেক সরু গলির মুখেই তৈরি হয়েছে বাণিজ্যিক স্থাপনা। ফলে অগ্নিকাণ্ড বা বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি কিংবা উদ্ধারকারী দল পারবে না প্রবেশ করতে। অনেক এলাকায় জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্সও পারে না পৌঁছাতে।
শহরের ছোট শালগাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলামের প্রশ্ন, ‘এত প্রাচীন একটি পৌরসভা আমাদের কী সেবা দিচ্ছে?’ তার অভিযোগ, আতাইকুলা সড়কে সামান্য বৃষ্টিতেই জমে কোমরসমান পানি। বাসাবাড়িতে পানি উঠে গেলেও বছরের পর বছর এ সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। এখন বর্ষার সময় সংস্কারের নামে খুঁড়ে রাখা হয়েছে রাস্তা। কয়েক মাস ধরে অসম্ভব হয়ে পড়েছে চলাচল।
অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি প্রতিদিনের নাগরিক জীবনেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শহরের প্রধান আব্দুল হামিদ রোডসহ অধিকাংশ সড়কই সরু ও নাজুক। এর সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে অটোরিকশার অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল যোগ হওয়ায় দিনের প্রায় পুরো সময়ই যানজটে স্থবির হয়ে থাকে শহর।
রাত নামলেই আবার অনেক সড়ক ডুবে যায় অন্ধকারে, কারণ পর্যাপ্ত সড়কবাতির ব্যবস্থা নেই। ভাঙাচোরা সড়ক ও আলোর অভাবে সাধারণ মানুষের চলাচল যেমন কষ্টকর, তেমনি বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও।
যানজটের এ চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ— জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। শহরের গাছপাড়া, নুরপুর, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বর্জ্য ফেলা হয় উন্মুক্তভাবে। এতে ছড়ায় দুর্গন্ধ, বাড়ে পরিবেশ দূষণ। অন্যদিকে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই অধিকাংশ মহল্লা পানির নিচে চলে যায়। ভারী বর্ষণে পানি উঠে আসে প্রধান সড়কেও। এতে জনজীবন যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক চলাচল।
এ দুর্ভোগের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে সাধারণ বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতায়। রিকশাচালক মহসিন ও দুলাল জানালেন, সড়ক সরু হওয়ায় প্রায় সারাক্ষণ আটকে থাকতে হয় যানজটে। অধিকাংশ রাস্তাই ভাঙা। রাতে সড়কবাতি না থাকায় রিকশা চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নাগরিক সেবার ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে। আটুয়া এলাকার বাসিন্দা আলতাফ হোসেনের দাবি, পৌরসভার বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা বলতে কিছু নেই। নিজ খরচে পরিষ্কার করতে হয় আবর্জনা। পানি সরবরাহের পুরনো ব্যবস্থার কারণে বাধ্য হয়ে অনেকেই বসিয়েছেন সাব-মার্সিবল পাম্প। এলাকার ড্রেনগুলোর মুখও বন্ধ। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি ঢুকে পড়ে ঘরে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এসব সমস্যার সমাধান খণ্ড খণ্ড প্রকল্পে নয়; প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা। এক্ষেত্রে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আশরাফুজ্জামান প্রামাণিকের পরামর্শ, একটি মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে জমির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বাজার, আবাসিক এলাকা ও টার্মিনালকে আলাদা জোনে স্থানান্তর, প্রশস্ত সড়ক, কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ও নিরাপদ পানির সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই হবে না কোনো উন্নয়ন প্রকল্প। এজন্য সরকারের বিশেষ নজর ও বড় বরাদ্দ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।
তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হিসেবে অর্থ সংকটের কথা বলছে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। পাবনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. দুলাল হোসেনের ভাষ্য, ‘পৌরসভার রাজস্ব আহরণ বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়ে যায় প্রায় ১২ কোটি টাকা। অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে এত বড় অবকাঠামোগত সংকট দূর করা প্রায় অসম্ভব।’
তার মতে, সরকারি বা বৈদেশিক বিশেষ বরাদ্দ ছাড়া মহাপরিকল্পনার ভিত্তিতে একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক নগর গড়ে তোলা কঠিন।




