লিফট সংকটে রোগীদের ভরসা স্বজনের কাঁধ
- মেডিকেলের ১৫টি লিফটের ৯টিই অচল
- রোগীদের ওয়ার্ডে উঠতে হচ্ছে সিঁড়ি বেয়ে
- সচল লিফটের জন্য অপেক্ষা ১৫-২০ মিনিট
- লিফটম্যান প্রয়োজন ৪৫ জন, কর্মরত মাত্র ১৩
- বৃষ্টির পানি ঢুকে নষ্ট লিফটের যন্ত্রাংশ

সংগৃহীত ছবি
স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে কষ্ট হয়, এমন রোগীকে উঠতে হচ্ছে সিঁড়ি বেয়ে। আবার কোনো কোনো রোগীকে চার-পাঁচতলার ওয়ার্ডে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছেন স্বজনরা। কেউ আবার লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে করতে হয়ে পড়ছেন ক্লান্ত। দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমন দুর্ভোগ এখন নিত্যদিনের চিত্র। হাসপাতালের ১৫টি লিফটের মধ্যে ৯টিই অচল থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের পোহাতে হচ্ছে বাড়তি দুর্ভোগ।
হাসপাতালের সচল ছয়টি লিফটে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স ও খাবার পরিবহনের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একটি লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ১৫-২০ মিনিট পর্যন্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লিফট পরিচালনায় জনবল সংকট ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ। সব মিলিয়ে হাসপাতালের লিফট ব্যবস্থাপনা নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ।
জানা গেছে, হাসপাতালের মূল ভবনের ১০টি লিফটের মধ্যে ৭টিই বন্ধ। মূল ফটকসংলগ্ন ৭ ও ৮ নম্বর লিফট অচল দীর্ঘদিন ধরে।
লিফট দুটির সামনে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে কয়েকজন রোগীকে। ফলে ওই অংশে রোগীদের চলাচল হয়ে পড়েছে আরও কঠিন। এর পাশের ৫ নম্বর লিফট নির্ধারিত চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য। আর ৬ নম্বর লিফট ব্যবহৃত হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের পাশাপাশি খাবার ও ওষুধ পরিবহনেও। এতে সাধারণ রোগীদের যাতায়াতের জন্য কার্যত একটি লিফটের ওপরই সৃষ্টি হয়েছে বাড়তি চাপ।
জরুরি বিভাগের ফটকসংলগ্ন ১ নম্বর লিফটেও রোগী-স্বজনদের পাশাপাশি খাবার পরিবহন এবং চিকিৎসক-নার্সদের যাতায়াত করতে হচ্ছে। এর পাশের ২, ৩ ও ৪ নম্বর লিফট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। মেডিসিন ওয়ার্ডের সামনে থাকা ৯ নম্বর লিফটটিও অচল। পাশের ১০ নম্বর লিফটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বন্ধ রয়েছে সেটিও। অচল হাসপাতালের ওপিডি ভবনের দুটি লিফটও।
লিফট পরিচালনায় জনবল সংকটও প্রকট। ১৫টি লিফট তিন শিফটে পরিচালনার জন্য অন্তত ৪৫ জন লিফটম্যান প্রয়োজন হলেও কর্মরত মাত্র ১৩ জন। এর সঙ্গে লিফটম্যানদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগও রয়েছে। লিফটম্যান মো. আমান জানিয়েছেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘদিন ধরে লিফটগুলো বন্ধ রয়েছে। এতে দুই ভবনেই রোগীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
পটুয়াখালী থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী মো. সাইফুল ইসলামের স্বজন জাহাঙ্গীর হোসেন জানাচ্ছিলেন তার অভিজ্ঞতা। বলছিলেন, ‘রোগীকে নিয়ে চারতলায় উঠতে গিয়ে প্রথমে দেখি লিফটের সামনে রোগী শুয়ে আছে। লিফট অচল থাকায় পরে আরও দুটি লিফটের সামনে গিয়ে সেগুলোও নষ্ট পাই। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের কিছু লোককে টাকা দিয়ে তাদের সহযোগিতায় সিঁড়ি বেয়ে রোগীকে চারতলায় নিতে পেরেছি।’
নগরীর কাউনিয়ার বাসিন্দা জগলুল হায়দারের ভাষ্য, জরুরি রোগীকে নির্ধারিত ওয়ার্ডে নেওয়া ও সুচিকিৎসা দেওয়ার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে লিফট। সময় নষ্ট হলে রোগীর প্রাণও চলে যেতে পারে। তার খালাতো ভাই এখানে ভর্তি জানিয়ে বলছিলেন, বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে চারতলা থেকে বারবার ওঠানামা করতে হয়। নয় দিনের মধ্যে লিফট পেয়েছি মাত্র দুদিন।
হাসপাতালের মিডিয়া মুখপাত্র ডা. মো. মাজহারুল রেজওয়ান রেজা জানালেন, অচল নয়টি লিফট সচল করতে কয়েকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে গণপূর্ত বিভাগকে। লিফটম্যান সংকট, দায়িত্বে অবহেলাসহ বিভিন্ন সমস্যার কথাও জানানো হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে রোগীদের দুর্ভোগ কমবে বলে আশাবাদী তিনি।
‘লিফটের ভেতরে বৃষ্টির পানি ঢুকে অনেক যন্ত্রাংশ অচল হয়ে গেছে। লিফট সংস্কারের কাজ চলছে। নতুন করে টেন্ডারের মাধ্যমে বাকি লিফটগুলোর সংস্কারকাজও দ্রুত শুরু হবে’— যোগ করলেন হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ আলম।




