নৌপুলিশে রক্ষা ৩৭ জীবন

দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ পরিবহনের বাস ডুবে যায় পদ্মা নদীতে। ছবি : আগামীর সময়
নৌপুলিশের অনড় অবস্থানে ভয়াবহ এক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেল ৩৭ বাসযাত্রীর জীবন। গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে‘ এসবি সুপার ডিলাক্স’ পরিবহনের যাত্রীবাহী বাস ডুবে যায় পদ্মা নদীতে। তবে ফেরিতে ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে নৌপুলিশ জোর করে সব যাত্রীকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তারা।
আড়াই মাস আগের ২৬ জনের প্রাণহানির ট্র্যাজেডি মাথায় রেখে নৌপুলিশের নেওয়া তাৎক্ষণিক ও দূরদর্শী পদক্ষেপই ৩৭টি পরিবারকে বাঁচিয়েছে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য বলছে, কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী বাসটি যখন দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে থাকা ‘বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর’ ফেরিতে ওঠার চেষ্টা করছিল, তখন হ্যান্ডমাইকে যাত্রীদের নেমে যাওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছিল। কিন্তু অনেক যাত্রীই গরমে বা অলসতার কারণে বাস থেকে নামতে চাচ্ছিলেন না।
বাসের যাত্রী এবং বিজিবি সদর দপ্তরের নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষক আবদুস সালাম বলছিলেন, ‘আমি প্রথমে বাস থেকে নামতে চাইনি। কিন্তু নৌপুলিশের সদস্যরা আক্ষরিক অর্থেই জোর করে আমাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দেন। আমি নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বাসটি চোখের সামনে নদীতে তলিয়ে যায়। এখন মনে হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের বাঁচাতে পুলিশ পাঠিয়েছিলেন।’
ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন জানান, নৌপুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত এবং কঠোর অ্যাকশনের কারণেই বাসটি ফাঁকি দিয়ে যাত্রীসহ ফেরিতে উঠতে পারেনি। সবাইকে নামানোর পরপরই বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের ‘করবী’ ফেরির র্যাম্পে সজোরে ধাক্কা দিয়ে পদ্মায় পড়ে যায়। দুর্ঘটনার সময় বাসের ভেতরে শুধু চালক মো. ঝন্টু আলী ও তার সহকারী (হেলপার) ছিলেন। চালক ঝন্টু আলী জানান, ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ গাড়ির ব্রেক ফেল করে। তিনি হেলপারকে লাফ দিতে বলে নিজে গাড়িসহ পানিতে তলিয়ে যান। পরে জানালার কাচ ভেঙে সাঁতার কেটে ওপরে ওঠেন।
স্থানীয় উদ্ধারকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের দুজনকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠান। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শরিফুল ইসলাম জানান, তারা দুজনেই বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত এবং তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিআইডব্লিউটিএ, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড ও জেলা প্রশাসনের উদ্ধারকারী দল। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ দুপুর ১২টার দিকে নদীর তলদেশ থেকে বাসটি ওপরে তুলে আনে। গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস উপস্থিত থেকে যাত্রীদের মালামাল বুঝিয়ে দেন।
সাথী দাস বলেছেন, ‘নৌপুলিশের দারুণ ভূমিকা ও সমন্বিত উদ্যোগের ফলে আজ (গতকাল) বড় প্রাণহানি এড়ানো গেছে। মানুষের জীবন রক্ষায় এই নিয়ম মানার কোনো বিকল্প নেই।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সব সংস্থাকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রফিকুল করিমের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা ঘোষণা করেন।
এদিকে দৌলতদিয়ার এই দুর্ঘটনার পর টনক নড়েছে আরিচা ও পাটুরিয়া ফেরিঘাট কর্তৃপক্ষের। গতকাল বিকাল থেকেই পাটুরিয়ার ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ঘাটে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখা গেছে। নৌপুলিশ ও বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা প্রতিটি বাস থামিয়ে যাত্রীদের বাধ্যতামূলকভাবে নামিয়ে দিচ্ছেন। ঈদের সময় যে নিয়ম বাস্তবায়নে শিথিলতা ছিল, গতকাল দৌলতদিয়ায় নৌপুলিশের সাফল্যের পর তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।




