‘আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই’

ছবি: আগামীর সময়
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার কবুতরখালীর বাসিন্দা রোকসানা বেগম তার পাঁচ মাস বয়সী ছেলে হুজাইফা রহমানকে ভর্তি করেছেন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। প্রথমে জ্বর দেখা দিলে মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত সপ্তাহের মঙ্গলবার তাকে বরিশালে পাঠানো হয়। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া হুজাইফা এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানটিতে শিশুদের জন্য আইসিইউ না থাকায় প্লাস্টিকের বাক্স কেটে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে তাকে। পাশে বসে নাতির দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া পড়ছেন নানি জহুরা খাতুন।
জহুরা খাতুন বলেছেন, ‘চিকিৎসকরা বলছেন হাম হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তির পরপরই শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে শুরু করে। এরপর আমার নাতিকে অক্সিজেন দিতে বলা হয়। আইসিইউ না থাকায় বাইরে থেকে প্লাস্টিকের বাক্স কিনে সেটির মধ্যে দিয়ে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। হামের যে ভয়াবহতা, তাতে এখন বলতে খুব কষ্ট হলেও আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
শুধু হুজাইফাই নয়, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড জুড়ে এখন হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিড়। গত শুক্রবার রাতে বরগুনার বামনা উপজেলা থেকে তিন মাস বয়সী শিশু জান্নাতকে ভর্তি করা হয়। তার পুরো শরীর লালচে ছোপ ছোপ দাগে ভরে গেছে। শিশু ওয়ার্ডে শ্বাস ফেলারও জায়গা নেই। তাই বারান্দায় তাকে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন স্বজনরা। কোনো কিছুতেই থামছে না ছোট্ট জান্নাতের কান্না।
জান্নাতের খালা শামসুন্নাহার বেগম বলেছেন, ‘চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের বাচ্চার অবস্থা ভয়াবহ। আমরা হতাশ, নিরুপায়। এই হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হাম ছাড়া আর কোনো রোগী নেই। আমাদের বাচ্চাদের নিয়ে এখানে এসে, এখানকার অবস্থা দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।’
গত কয়েক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। শনিবার বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার শহিদুল ইসলামের ৯ মাস বয়সী ছেলে সাজ্জাদ। গত রবিবার পটুয়াখালীর খলিসাখালী সদর এলাকার জাহাঙ্গীরের ছয় মাস বয়সী ছেলে সাইফ, সোমবার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উত্তর দাদপুর এলাকার আলামিনের পাঁচ মাস বয়সী ছেলে আলী আকবর এবং ভোলার দৌলতখান উপজেলার বাংলাবাজার মধ্যজয়নগরের চালতাতলী এলাকার ফয়জুদ্দিনের ছয় মাস বয়সী ছেলে আব্দুল আহাদ মারা যায়।
গতকাল মঙ্গলবারও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া হাফসা, মৃদুল, বর্ণা, তানিম, তৃষা ও রহমানসহ ৬ থেকে ১০ মাস বয়সী বেশ কয়েকজন শিশু বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাদের অনেকেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। সন্তানদের বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অভিভাবকরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে মূলত ২০টি শয্যা রয়েছে। হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ার পর আরও ২৮টি শয্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তারপরও প্রতিদিন ২০০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকছে। ফলে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
শিশুদের জন্য আইসিইউ না থাকায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। চলতি বছরে হামের উপসর্গ নিয়ে এই হাসপাতালেই ৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত সাত দিন ধরে প্রতিদিনই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এ পর্যন্ত ২ হাজার ৬১৪ শিশু এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ শিশু চিকিৎসাধীন থাকে। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে অনেক অভিভাবক বারান্দায় চাদর পেতে সন্তানদের চিকিৎসা করাচ্ছেন।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম জানিয়েছেন, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি বলেছেন, ‘সব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য কোনো জেলাতেই আইসিইউ ব্যবস্থা নেই। হামের উপসর্গ নিয়ে বরিশাল বিভাগে এখন পর্যন্ত ৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৬ হাজার ৫৬৪ শিশু। তাদের মধ্যে ৫ হাজার ৭৯৮ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে।’
তিনি আরও জানিয়েছেন, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর পটুয়াখালীতে সবচেয়ে বেশি, ১ হাজার ৯৭৯ রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। আর মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে ভোলা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে, যেখানে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিভাগের গুরুতর রোগীদের বেশিরভাগই বরিশালে পাঠানো হয় বলেই এখানে মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৪৩ শিশু ভর্তি হয়েছে।
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা থেকে ১৯ মে ১১ মাস বয়সী মেয়ে নাজিফা রহমানকে বরিশালে ভর্তি করান স্কুলশিক্ষক শিল্পী রহমান। বলেছেন, ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালে এসেছি। কিন্তু এখানে চিকিৎসার অবস্থা খুবই খারাপ। ছোট ছোট শিশুদের অনেকের অবস্থা ভয়াবহ। মুখে খাবার পর্যন্ত তুলতে পারছে না। এত বড় হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি থাকলেও শিশুদের জন্য আইসিইউ নেই।’
‘বাইরে থেকে প্লাস্টিকের পাত্র কেটে তার মধ্যে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। চিকিৎসকরাও নিরুপায়। যা আছে, তাই দিয়ে চেষ্টা করছেন। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল থামছে না।’
হাসপাতালটির শিশু বিভাগের প্রধান ডা. বিকাশ চন্দ্র নাগ বলেছেন, ‘এই হাসপাতালে শিশুদের জন্য উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। অক্সিজেনের সেন্ট্রাল লাইন ব্যবহার করে হেড বক্সের পরিবর্তে প্লাস্টিকের বাক্সে অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। শিশুদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড, হাই-ফ্লো অক্সিজেন এবং আইসিইউ চালু করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে সাধারণ রোগীদেরও হাম আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যা অন্য শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’
‘রোগীর চাপ সামাল দিতে শিশু ওয়ার্ডে আরও চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন।’
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর জানালেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় আমাদের সাধ্যের মধ্যে কোনো ঘাটতি রাখা হচ্ছে না। নানা সংকটের মধ্যেও চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। শিশু ওয়ার্ডের সংকটের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা (তৎকালীন মন্ত্রী হিসেবে উদ্ধৃত) সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। বললেন, ‘বরিশালের আমানতগঞ্জ এলাকায় ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। আমার ইচ্ছা আগামী ১ আগস্ট হাসপাতালটি চালু করার। দ্রুত জনবল নিয়োগও সম্পন্ন হবে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। হাসপাতালটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের শিশুরা আরও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাবে।’
হামের প্রাদুর্ভাবে যখন দক্ষিণাঞ্চলের হাসপাতালগুলোয় শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে, তখন আইসিইউ ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধার অভাব নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। আর হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা অসুস্থ শিশুদের পাশে বসে স্বজনদের কণ্ঠে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে একটাই বাক্য— ‘আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’






