শ্রীমঙ্গলে ৪ কোটি টাকার সড়ক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

সড়ক নির্মাণে অনিয়ম, ইউএনওর কাছে এলাকাবাসীর অভিযোগ। ছবি: আগামীর সময়।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নে প্রায় ৪ কোটি ৫ লাখ টাকার একটি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে অভিযোগ উঠেছে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও অনিয়মের। অভিযোগের প্রতিবাদে রবিবার এলাকাবাসী নির্মাণাধীন সড়কের আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ বন্ধ করে দেন। একই সঙ্গে তারা শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পে উন্নতমানের বালু, পাথর ও খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে বালু, রাবিশ, পুরোনো ইটের খোয়া ও পাথরের গুঁড়া দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সানি এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে উঠেছে এসব অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মান বজায় না রেখেই নির্মাণকাজ পরিচালনা করছে।
উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় হতে জানা যায়, কালিঘাট-মনু-দলই সার্কুলার রোড সংস্কারের জন্য ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি কার্যাদেশ জারি করা হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
হোসেনাবাদ-বিলাসছড়া সড়কটি আশিদ্রোন ও কালিঘাট ইউনিয়নের হোসেনাবাদ গ্রামসহ সাতটি চা-বাগান এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে ভারী ট্রাক, জিপ, কাভার্ড ভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করে। পাশাপাশি কয়েক হাজার চা-শ্রমিকও এই সড়ক ব্যবহার করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার পাশের পুরোনো গাইডওয়াল মেরামত করে তার ওপর ইটের পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণাধীন অবস্থাতেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। এছাড়া গাইডওয়ালের পাশে বালু ও স্বল্প সিমেন্ট মিশ্রিত বস্তা ব্যবহার এবং যথাযথভাবে রোলার বা ভাইব্রেটর দিয়ে কমপ্যাকশন না করায় নির্মাণকাজের স্থায়িত্ব নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহিন মিয়া বলছিলেন, ‘এলজিইডির নিয়মিত তদারকির অভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো কাজ করছে। কাজের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরিমাণে রড, সিমেন্ট, পাথর ও মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার না করায় কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
খোকন তাঁতি বলছিলেন, ‘কোটি কোটি টাকার প্রকল্পে যদি পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয় এবং তা দেখার কেউ না থাকে, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে।’
বিনোদ তাঁতি, সঞ্জয় মুন্ডাসহ স্থানীয় অনেকেই জানান, অনিয়মের অভিযোগে তারা নির্মাণকাজ বন্ধ করে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
পথচারী নুরুল ইসলাম বলছিলেন, ‘কোটি টাকার প্রকল্প হলেও কাজে মানের কোনো ছাপ দেখা যাচ্ছে না। এভাবে চললে কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।’
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক জাফর আলী বললেন, ‘আমরা ঠিকাদারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি। তিনি যেভাবে করতে বলেন, সেভাবেই কাজ করি।’
উপজেলা এলজিইডির কার্যসহকারী আবু বকর সিদ্দিক বলেছেন, ‘শিডিউল অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। তবে সেলভেজ ইট ব্যবহারের কারণে কিছু ইটের মান তুলনামূলক নিম্নমানের হতে পারে।’
সানি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. হাসানুজ্জামান উল্লেখ করেন, ‘যে ইটগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে সেগুলো সরকারি সেলভেজ মালামাল। টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী প্রায় ৭৫ লাখ টাকা দিয়ে এসব ইট কিনেছি এবং খোয়া হিসেবে ব্যবহার করছি। নতুন অংশের কাজে কোনো সমস্যা হয়নি। পুরোনো অংশে কিছু ত্রুটি দেখা দিলে সেখানে প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
উপজেলা এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী সঞ্জয় পণ্ডিত বলেন, ‘প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪ কোটি ৫ লাখ ২২ হাজার ৮৪৬ টাকা। এর মধ্যে সেলভেজ সামগ্রীর বাবদ প্রায় ৭৫ লাখ টাকা সরকারি তহবিলে জমা হবে। ফলে প্রকৃত ব্যয় প্রায় ৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সব কাজই নিম্নমানের হচ্ছে, এমন অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটি বা কমবেশি থাকতে পারে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুর রাকিব বলেছেন, ‘আমি মাঝেমধ্যে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলীর ওপর রয়েছে। অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে তা অপসারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেছেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমি জেলা প্রশাসককে অবহিত করেছি। এলজিইডির কর্মকর্তাদের দিয়ে অভিযোগ তদন্ত করা হবে। চলমান উন্নয়নকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




