বিকল স্টিয়ারিং নিয়ে এত বড় জাহাজ কেন বন্দরে
- সিএনসি ইউরেনাসে বড় কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে সিঙ্গাপুরে
- পরবর্তী বন্দরে ঢোকার আগে কথা ছিল অবহিতের
- চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভেড়ানোর সময় ঘটে দুর্ঘটনা

প্রতীকী ছবি
বিদেশি কনটেইনার জাহাজ সিএনসি ইউরেনাসের দুটি বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়েছিল গত ৩০ জুলাই। সিঙ্গাপুর ছেড়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক সার্ভে প্রতিষ্ঠানের জরিপে সেই ত্রুটি চিহ্নিত হয়েছিল।
জাহাজমালিককে এই বলে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী বন্দরে ঢোকার আগে অবশ্যই এই ত্রুটির বিষয়ে অবহিত করতে হবে। এই ত্রুটি সারিয়ে ঝুঁকিমুক্ত জাহাজ চলাচলের জন্য সেই প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ তাগাদাও দেওয়া হয়েছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর ও নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরকে না জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভেড়ানোর সময় দুর্ঘটনা ঘটে জাহাজের।
যে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল, সে কারণেই জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের প্রবেশমুখে পৌঁছে নিয়ন্ত্রণ হারায়। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জাহাজটি সংকেত বয়ায় সজোরে ধাক্কা দেয় এবং ভাসতে ভাসতে নৌবাহিনীর স্থাপনার পাশে রিটেইনিং ওয়ালে আটকে অচল হয়ে যায়। চট্টগ্রাম বন্দর অচলের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায় দেশ। বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রায় ১২ ঘণ্টা পর গত সোমবার গভীর রাতে জাহাজটিকে উদ্ধার করা হয়।
চীনের শিকো বন্দর থেকে জাহাজটি প্রথমে সিঙ্গাপুর বন্দরে থামে। সেখান থেকে ১ হাজার ২৮২ একক আমদানি কনটেইনার নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। যাত্র শুরুর আগে ৩০ জুলাই জাহাজের জরিপ করে আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি ডিএনভি। সেই জরিপ প্রতিবেদনে স্পষ্ট লেখা আছে, সিঙ্গাপুরে ডেক অ্যান্ড ইঞ্জিন অনুসন্ধানের সময় জাহাজটির স্টিয়ারিং গিয়ার হাইড্রোলিক লক অ্যালার্ম সিস্টেম বিকল চিহ্নিত হয়। ওই সময় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন ও টেকনিক্যাল নোটিস অনুযায়ী জাহাজটি যেসব বন্দরে ভিড়বে, সেখানকার স্থানীয় পাইলট এবং বন্দর কর্তৃপক্ষকে বাধ্যতামূলকভাবে এই যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়ে অবহিত করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু জাহাজটির ক্রু বা প্রতিনিধি চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশের আগে বন্দর কর্তৃপক্ষকে এই তথ্য লুকান। এমনকি জাহাজটি যখন সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ভেড়ার জন্য বহির্নোঙর থেকে আসছিল, তখনো জানায়নি শিপিং এজেন্ট।
শিপিং এজেন্ট কেন এ তথ্য লুকিয়েছে, তা জানতে জাহাজের শিপিং এজেন্ট আমেরিকান প্রেসিডেন্ট লাইন (এপিএল) চট্টগ্রাম শাখাপ্রধান এনামুল হক টিটুকে মোবাইল ফোনে কল ও মেসেজ পাঠিয়ে মন্তব্য চাইলেও সাড়া না দেওয়ায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানিয়েছেন, জাহাজের হাইড্রোলিক লক অ্যালার্ম নষ্ট থাকে, তবে জাহাজ চলার সময় যদি বাস্তবেই স্টিয়ারিং ‘লক’ হয়ে যায়, তবে ব্রিজে থাকা নেভিগেশন অফিসার বা ক্যাপ্টেন তা তৎক্ষণাৎ জানতে পারবেন না। ফলে জাহাজের চালক বুঝতে পারার আগেই জাহাজটি দিক হারিয়ে চ্যানেল, জেটি বা অন্য জাহাজে সজোরে আঘাত করে বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়তে পারে।
অচল হয়ে চরে আটকে যাওয়ার পর সোমবার রাতে জাহাজটি উদ্ধার করে বিশেষ ব্যবস্থায় টেনে সাগরের ব্রাভো অ্যাংকরেজে নেওয়া হয়। জাহাজ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এপিএল লিখিত আবেদন করে জানায়, সিএনসি ইউরেনাস এখন সচল আছে। প্রতিষ্ঠানটির অনুরোধের পর বুধবার জাহাজটি জেটিতে আনার অনুমতি দেয় কর্তৃপক্ষ। বিকাল ৩টায় বন্দরের তিনজন সিনিয়র পাইলটকে জাহাজে পাঠানো হয়। জাহাজের নোঙর তোলা হয়। চালিয়ে নেওয়ার আগে ত্রুটি ধরা পড়লে বন্দর পাইলটরা জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে সার্ভে রিপোর্ট চান। প্রথমে জাহাজ ক্যাপ্টেন সেই রিপোর্ট দিতে চাননি। পরে রিপোর্ট হাতে পেয়ে পাইলটরা হতভম্ব হয়ে যান। যেজন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে, একই কারণে ৩০ জুলাই ধরা পড়ে সার্ভে রিপোর্টে। পাইলটরা জাহাজ থেকে বন্দরকে এই বিষয় অবহিত করেছেন। জাহাজ চালানোর অপারগতা প্রকাশ করে জাহাজ থেকে নেমে যান পাইলটরা।
এসব বিষয় জানতে বন্দর পাইলটদের কল করা হয়। কিন্তু তারা ফোনে সাড়া দেননি বলে মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
তবে চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমোডর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ জানিয়েছেন, জাহাজ জেটিতে প্রবেশ আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। দুই সদস্যের কমিটি হয়েছে। কমিটির তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সোমবার এমন এক স্থানে জাহাজের স্টিয়ারিং বিকল হয়েছিল, যেখানে ডুবলে বন্দরে ঢোকার প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যেত। আর দেশের ৯২ শতাংশ পণ্য আমদানি-রপ্তানি পরিবহনকারী চট্টগ্রাম বন্দরের এই লাইফলাইন অচল হয়ে যেত।
এতবড় ঝুঁকি আছে জেনেও শিপিং এজেন্ট কয়েক হাজার কোটি টাকার পণ্য নিয়ে জাহাজ বন্দরে ভেড়াতে চেয়েছিল। বৃহস্পতিবার বন্দরের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে জাহাজ জেটিতে ভেড়ার অনুমতির জন্য নানাভাবে তদবির করছিল। দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবও খাটাচ্ছিল।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ অনুযায়ী, জাহাজের যান্ত্রিক ত্রুটির তথ্য গোপন করে বিপজ্জনকভাবে বন্দরে প্রবেশ ও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে শিপিং লাইন বা জাহাজের মাস্টার বা শিপিং এজেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং আর্থিক জরিমানা আরোপের বিধান আছে। অপরাধের গুরুত্বভেদে জাহাজের মাস্টার, সিগনাল টিম বা শিপিং লাইনের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে ছয় মাস পর্যন্ত কারদণ্ড। বিচারিক আদালতে মামলা সাপেক্ষে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। আইনের বিধিনিষেধ অমান্য করার কারণে বন্দরে ফের প্রবেশের অনুমতি স্থগিত বা বাতিল করা হতে পারে। দুর্ঘটনার সময় কোনো বয়া, লাইটিং হাউজ, জেটি বা চ্যানেলের রিটেইনিং ওয়ালে ক্ষতি হলে তা সার্ভের মাধ্যমে নির্ধারণ করে পৃথকভাবে শতভাগ ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে।
তথ্য না জানিয়ে প্রবেশের অপরাধে বাংলাদেশ নৌ-বাণিজ্য দপ্তর জাহাজের শিপিং এজেন্টের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নিতে পারে। জাহাজ আটক করতে পারে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর এসব প্রভাবশালী শিপিং এজেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
জানতে চাইলে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী জানিয়েছেন, তথ্য লুকিয়ে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে বিপদে ফেলার চেষ্টা ভয়ানক অপরাধ। এমন ঘটনা কী কারণে ঘটেছে, এতে বন্দরের স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নির্ণয়ে কাজ করছে তদন্ত কমিটি। রিপোর্ট পেলেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।




