হরমুজ দিয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি আমদানি : ৬ জাহাজের ৫টি আসছে না!

ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালী দিয়ে ৬টি জ্বালানি তেল-গ্যাসবহনকারী জাহাজ বাংলাদেশে আসার কথা। শেষ পর্যন্ত আসছে মাত্র একটি! ইরান সরকার পার হওয়ার অনুমতি দেওয়ার তিনদিন পর জানা গেল এ তথ্য।
বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান এই অনুমতি দিয়েছিল। এ ৬টি জাহাজে মোট ৫ লাখ ৭৯ হাজার টন এলএনজি এবং জ্বালানি তেল আসার কথা ছিল চট্টগ্রাম বন্দরে। যেটির আসার সম্ভাবনা তাতে রয়েছে ৭৯ হাজর টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল।
তেলবাহী এ জাহাজটি সৌদি আরব থেকে দেশে আসার পরিকল্পনা থাকলেও সেটি এখন নতুন জটিলতায়। অনুমতি পাওয়া তেলবাহী এই জাহাজটি ভাড়া করেছে মার্কিন কোম্পানি। এই অবস্থায় সেই জাহাজ তেল নিয়ে রওনা দিতে ঝুঁকিতে পড়েছে। সরকার চাইছে কূটনৈতিক চ্যানেলে সেটি সমাধান করতে।
এসব জটিলতা সামাল দিতে বিকল্প উৎস থেকে সহজে জ্বালানি সংগ্রহের নতুন চিন্তা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।
দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন অভিভাবক সংস্থা বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে এম সামছুল আহসান বলছেন, ‘আমরা দুইভাবে পরিকল্পনা নিয়ে তেল-গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি। একটি হচ্ছে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বুঝিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। দ্বিতীয়টি হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প পথে সরবরাহ চেইন নিশ্চিত রাখা।’
মূলত গ্যাস সরবরাহকারী দেশ কাতার-ওমানের কোম্পানিগুলো যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে 'ফোর্স মেজর' (অনিবার্য বাধা) জারি করায় এই বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস আপাতত দেশে আসছে না। আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো সাধারণত 'ওয়ার রিস্ক ইনস্যুরেন্স' বা যুদ্ধকালীন বিমা ছাড়া জাহাজ পরিচালনা করে না। যদিও ইরান বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নিরাপদ চলাচলের আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু বৈশ্বিক বিমা কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালীকে এখনো 'রেড জোন' হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে। বিমা না পাওয়ায় এবং প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হওয়ায় সরবরাহকারীরা এই ৫টি জাহাজ বাংলাদেশের পাঠাতে সাহস পাচ্ছে না।
ওমান-কাতার-সৌদি আরবের পরিবর্তে সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া-ভারত থেকে তেল আমদানি বাড়িয়ে সরবরাহ সংকট সামাল দিতে সরকার নানামুখী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব দেশ থেকে তেল আনতে হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। যদিও এসব দেশ থেকে তেল আনতে বাড়তি খরচ গুনতে হতে পারে। এরপরও সরকার বাড়তি দাম দিয়ে হলেও তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার নিরন্তর চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরান সরকার। পরে বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাস সরবরাহে ধস নামলে ইরান প্রতিবেশী এবং নিজেদের মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশে বিশেষ মানবিক বিবেচনায় তেল-গ্যাস পরিবহনকারী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান ও ইরাকের জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে ইরান।
ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি ১ এপ্রিল ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অনুমতির বিষয় নিশ্চিত করেন। এর আগে বাংলাদেশ সরকার ছয়টি জাহাজের তালিকা ইরানকে দেয়। কিন্তু সেই ৬টি জাহাজের নামের তালিকা প্রকাশ করেনি ইরান ও বাংলাদেশ সরকার। পরে দেখা গেছে ৫টি জাহাজের সরবরাহের অনুমতি আগেই বাতিল করে দিয়েছে কাতার এবং ওমানের প্রতিষ্ঠান।
বিপিসি'র এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে আভাস দেন এই বলে যে, ছয়টি জাহাজের পাঁচটিই ৮ মে পর্যন্ত সরবরাহ স্থগিত করে রাখা হয়েছে। কাতার এনার্জি এবং ওমানের ওকিউ ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে এই এলএনজি সরবরাহের চুক্তি ছিল। যুদ্ধের কারণে হামলার শঙ্কায় সরবরাহকারী এই গ্যাস সরবরাহ দিতে চাইছে না। ৮ মের মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলে হয়তো সেই প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
‘এমটি-নরডিক পোলাক্স’ ৭৯ হাজার টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে সৌদি আরবের রাস তানুবা বন্দরের কাছে নোঙর করে আছে এখনো। কিন্তু এই জাহাজটি ভাড়া করেছে আমেরিকার প্রতিষ্ঠান নরভিক এনার্জি। ফলে আমেরিকার প্রতিষ্ঠানের ভাড়া করা জাহাজে তেল নিয়ে সৌদি আরব থেকে হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিতে কিছুটা ঝুঁকি অনুভব করছে। কারণ ইরান আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মিত্রদের হরমুজ প্রণালীতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এই অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের মাধ্যমে পুনরায় অনুমোদন রি-চেক করতে চাইছে। ডাবল কনফার্ম হলেই কেবল জাহাজটি সৌদি আরব ছাড়বে বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্র।
চলতি এপ্রিল মাসে ৩ লাখ ২৩ হাজার টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির করার পরিকল্পনা রয়েছে বিপিসির।






