মনজুর যোগ দিচ্ছেন না, হাল ছাড়বে না এনসিপি

সংগৃহীত ছবি
জোর গুঞ্জন থাকলেও আপাতত জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগ দিচ্ছেন না চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শিল্পপতি এম মনজুর আলম। পরিবারের সদস্যদের আপত্তিতে আপাতত রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন না তিনি। তবে এনসিপি নেতারা হাল ছাড়ছেন না, এমন আভাস মিলেছে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রামে এনসিপি এক যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে দলটির আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহসহ সিনিয়র কয়েকজন নেতা উপস্থিত থাকবেন। এই যোগদান অনুষ্ঠানকে ঘিরেই মূলত মনজুরের বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে।
এম মনজুর আলমের আপাতত এনসিপিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন। নগর কমিটির সমন্বয়কারী সদস্য রিদুয়ান হৃদয় বললেন, বিষয়টি তার জানা নেই।
প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ‘ভাবশিষ্য’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন মনজুর। টানা ১৭ বছর কাউন্সিলর ছিলেন। এক-এগারোর সময় মহিউদ্দিন কারাগারে গেলে মনজুরকে ভারপ্রাপ্ত মেয়র করে সেসময়ের পর্দার সামনে-পেছনের ক্ষমতাবানরা। এতে মহিউদ্দিনের সঙ্গে মনজুরের দূরত্ব হয়। ২০১০ সালে মনজুর বিএনপিতে যোগ দিয়ে গুরু মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে মেয়র পদে প্রার্থী হন। গুরুকে হারিয়ে মেয়রও নির্বাচিত হন।
২০১৫ সালে বিতর্কিত চসিক নির্বাচনে আবারও বিএনপির প্রার্থী হয়ে হেরে যান। সেসময় রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিলেও পরে আবার আওয়ামী লীগে ‘ওঠাবসা’ শুরু করেন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতনের পর হত্যাচেষ্টার এক ‘গণমামলায়’ মনজুরও আসামি হন।
বছর দু’য়েক নীরব থাকার পর গত রমজানে চট্টগ্রামে এনসিপির ইফতার মাহফিলে মনজুরের ছবিসহ খাবারের প্যাকেট ও পানির বোতল দেওয়া হয়। তখন মনজুরের ‘এনসিপি কানেকশন’ আলোচনায় আসে।
এরপর গত ১৪ এপ্রিল বিকেলে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ যান মনজুরের উত্তর কাট্টলীর বাসায়। সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হয়ে তিনি ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে পড়েন। তারা মনজুরকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার বাসায় যাওয়ায় হাসনাতের সমালোচনা করেন।
এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে চট্টগ্রামের এনসিপি নেতারা জানান, মনজুরকে দলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক এবং পরবর্তীতে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী করার প্রস্তাব নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ গিয়েছিলেন। তবে হাসনাতের সঙ্গে এনসিপির পদ নেওয়া ও মেয়র নির্বাচন করা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করেছিলেন মনজুর।
এ অবস্থায় এনসিপির যোগদান অনুষ্ঠানকে ঘিরে আবারও একই আলোচনা নিয়ে এম মনজুর আলমের অবস্থান জানতে ফোন করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, আজ সকাল থেকে তিনি মোবাইল বন্ধ রেখেছেন। অফিসেও যাননি। সকালে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় ডাল-চাল মিয়া শাহ’র মাজারে ওরশ অনুষ্ঠানে যান। বিকেল পর্যন্ত ফেরেননি।
ঘনিষ্ঠজনদের তথ্য, হাসনাত আবদুল্লাহর বাসায় যাওয়াকে কেন্দ্র করে মনজুরের বিরুদ্ধে সমালোচনার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে নেননি পরিবারের সদস্যরা। রাজনীতিতে তার সক্রিয় হওয়া নিয়ে তারা আপত্তি জানান। নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন বিশ্বস্ত উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও মনজুরকে আপাতত রাজনীতি কিংবা নির্বাচনে না জড়ানোর পরামর্শ দেন।
‘উনি (মনজুর) নিজ থেকে কাউকে কিছুই বলেননি। উনার নিজেরও আপাতত এনসিপিতে যোগ দেওয়ার তেমন আগ্রহ ছিল না। এরপর পরিবারের সদস্যরাও আপত্তি করছেন। এটা বলা যায় যে, আপাতত তিনি এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন না। রাজনীতিতেও আপাতত সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই’, বললেন মনজুরের ঘনিষ্ঠ একজন।
এনসিপির কয়েক নেতার ভাষ্য, মনজুরের বিষয়ে আপাতত তাদের দল ভিন্ন কৌশলে আগাচ্ছে। তাকে মেয়র প্রার্থী করার বিষয়টি চাউর হওয়ার পর বিএনপি-জামায়াতের প্রতিক্রিয়া আমলে নিয়েছে এনসিপি। জোটসঙ্গী জামায়াত তড়িঘড়ি করে সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালীকে তাদের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। বিএনপির মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনসহ একাধিক নেতাও এ বিষয়ে মুখ খোলেন।
এ অবস্থায় মনজুরকে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক করার সিদ্ধান্ত তারা বাদ দিয়েছেন। তবে চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী করার জন্য শেষপর্যন্ত চেষ্টা থাকবে বলে জানালেন এনসিপি নেতারা।
নগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিনের ভাষ্য, ‘মনজুর সাহেবকে দলের প্রাথমিক সদস্যপদ দিয়ে মেয়র পদে প্রার্থী করার চেষ্টা থাকবে।’
কাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে মহানগর এনসিপির পক্ষ থেকে যোগদান অনুষ্ঠানটি হবে। দলটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দল, এলডিপি, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, আপ বাংলাদেশসহ আরও কয়েকটি সংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মী এনসিপিতে যোগ দেবেন।
অবশ্য এনসিপি নেতা রিদুয়ান হৃদয়ের দাবি, রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ মিলিয়ে হাজারখানেক লোক এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু প্রেসক্লাবে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন যোগদানকারী উপস্থিত থাকবেন।



