সচিব বাবার কল্যাণেই এ প্লাস টেনেটুনে পাস করা ছেলের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাবা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব। ছেলে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ফলাফল প্রকাশের আগে বাবা দেখলেন, ছেলে টেনেটুনে পাস করেছেন। কিন্তু এতে তো সচিব বাবার ‘মান যাবে’। মান বাঁচাতে তিনি আশ্রয় নিলেন নজিরবিহীন জালিয়াতির। রচনামূলক ও নৈর্ব্যক্তিক মিলিয়ে ১৪টি উত্তরপত্রে সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ২৪ নম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে দিলেন। এতে ছেলে পেয়ে গেলেন ‘এ প্লাস’।
তবে ফল প্রকাশের পর সচিবের ‘কাঁচা হাতের’ এ জালিয়াতি ফাঁস হয়ে যায়। চাকরি যায়। মামলা হয়। তিনি জেলে যান। সেই ফলাফল বাতিলও হয়। মামলা তদন্ত শেষে গত ১৮ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন নগরীর পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম সফিউল আজম মুন্সী। এতে বাবা-ছেলেসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
আসামিরা হলেন— চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব নারায়ণ চন্দ্রনাথ, সাবেক সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খান ও সাবেক চেয়ারম্যান মুস্তফা কামরুল আখতার এবং নারায়ণের ছেলে ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী নক্ষত্র দেবনাথ। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আগামীর সময়কে বললেন, ‘চারজনকে আসামি ও ১১ জনকে সাক্ষী করে অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। আদালত ধার্য তারিখে অভিযোগপত্র পরীক্ষা করে আদেশ দেবেন।’
প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনের পাশাপাশি দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে বলে এসআই সফিউল আজম জানালেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জব্দ করা উত্তরপত্র ও নম্বর ফর্দ পর্যালোচনায় এবং তদন্তে নারায়ণ চন্দ্রনাথ ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিস্টেম অ্যানালিস্ট কিবরিয়া মাসুদ খানের সহায়তায় নক্ষত্র দেবনাথের ফলাফল পরিবর্তনে জড়িত ছিলেন বলে প্রমাণ হয়েছে। জালিয়াতিতে সহযোগিতার বিনিময়ে অবসরকালীন ছুটিতে থাকা কিবরিয়াকে ২০২৪ সালের ফলাফল প্রস্তুত করার কাজ দেওয়া হয় দৈনিক ২ হাজার টাকা ভাতার বিনিময়ে।
অভিযোগপত্রের তথ্য, রচনামূলকের উত্তরপত্রে নক্ষত্র দেবনাথ বাংলা প্রথম পত্রে পেয়েছিলেন ৩১ নম্বর। সেটি বাড়িয়ে ৪১ করা হয়। নৈর্ব্যক্তিকে পাওয়া ২৪ নম্বরের সঙ্গে আরও ২ নম্বর যোগ করা হয়। ইংরেজি প্রথম পত্র রচনামূলকে পান ৭০ নম্বর। বাড়িয়ে করা হয় ৯০। দ্বিতীয় পত্রে ৫৭ নম্বরের সঙ্গে ২৪ যোগ করে ৮১ নম্বর পাইয়ে দেওয়া হয়।
রচনামূলক পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রে ৩৪ নম্বরের সঙ্গে যোগ করা হয় আরও ৮ নম্বর। নৈর্ব্যক্তিক পদার্থ দ্বিতীয় পত্রে ২০ নম্বরকে আরও ২ নম্বর বাড়িয়ে ২২ করা হয়। রচনামূলক রসায়ন প্রথম পত্রে নক্ষত্র পান ৩০ নম্বর। সেটি বাড়িয়ে ৪০ করা হয়। নৈর্ব্যক্তিকে ৩ নম্বর বাড়িয়ে ২৩ নম্বর পাইয়ে দেওয়া হয়। রসায়ন দ্বিতীয় পত্রের নৈর্ব্যক্তিকে ৪ নম্বর বাড়িয়ে প্রাপ্ত নম্বর দেখানো হয় ২৩। অথচ পেয়েছিলেন ১৯। জীববিজ্ঞান প্রথম পত্রের রচনামূলকে ১০ নম্বর বাড়িয়ে করা হয় ৩৯। নারায়ণ চন্দ্রনাথ ২০১৯ সাল থেকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, সচিব ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছেলে নক্ষত্র দেবনাথ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র হিসেবে ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। করোনা-পরবর্তী যে পরীক্ষা ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছরের ২৬ নভেম্বর ফলাফল প্রকাশ হয়।
ফলাফল প্রকাশের পর নারায়ণ চন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে কে বা কারা তার ছেলের ফলাফল পুনর্নিরীক্ষণের জন্য শিক্ষা বোর্ডে আবেদন করেন। কিন্তু নারায়ণের স্ত্রী বনশ্রী দেবনাথ নগরীর পাঁচলাইশ থানায় পুনর্নিরীক্ষণ আবেদনের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এতে সন্দেহ আরও জোরালো হয়।
২০২৪ সালের জুনে জালিয়াতির অভিযোগ তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ৯ জুলাই নারায়ণকে শিক্ষা বোর্ড থেকে সরিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) বিভাগের চট্টগ্রামের পরিচালক পদে বসানো হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর তাকে জালিয়াতির অভিযোগে ওএসডি করা হয়। নক্ষত্রের ফলাফল বাতিল করা হয়। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের তৎকালীন সচিব অধ্যাপক ড. এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ নগরীর পাঁচলাইশ থানায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ১৭ জুন আদালতে আত্মসমর্পণের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি জামিনে আছেন।






