পাহাড়ধসে প্রাণহানি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছাড়তে কড়াকড়ি চসিকের

মেয়র চশমা হিল এলাকায় দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন
চট্টগ্রাম নগরের চশমা পাহাড় এলাকায় পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে শিশুর মৃত্যুর পর নিহতের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। আজ বুধবার বিকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন তিনি। এ সময় তিনি তাদের খোঁজখবর নেন এবং আর্থিক সহায়তা দেন।
হাসপাতালে যাওয়ার আগে মেয়র চশমা হিল এলাকায় দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলছিলেন, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পাহাড় কাটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কেউ অবৈধভাবে পাহাড় কাটতে না পারে। তবে দুর্ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে তিনি লক্ষ করেন, পাহাড়টি প্রায় খাড়া করে কাটা হয়েছে, যার ফলে পুরো এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
মেয়র জানান, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে যারা পাহাড় কেটেছে এবং এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
তার ভাষায়, এটি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্ভব হবে না।
মেয়র বললেন, টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়টি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। যেকোনো সময় আবারও ধস নামার আশঙ্কা আছে। এ কারণে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেন তিনি।
গত ৪৫ বছরের ইতিহাসে চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার এবং টানা তিন দিনে প্রায় ৬৮০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এতে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান মেয়র। তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘মানবিক দুর্যোগ’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক বিভাজন নয়, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। মানুষের জীবন রক্ষা করাই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত, প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের ইঙ্গিত
মেয়র জানান, জেলা প্রশাসন ও চসিকের উদ্যোগে নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সিটি করপোরেশনের আরবান হেলথ সেন্টারগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সেখানে আশ্রয় নেওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
চসিকের পৃথক অফিস আদেশ থেকে জানা যায়, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাসের পরিপ্রেক্ষিতে জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় নগরের ছয়টি অঞ্চলে মোট ছয়টি আশ্রয়কেন্দ্র সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে হোসেন আহম্মদ চৌধুরী সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, জুলেখা আমিনুর রহমান সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়, বাগমনিরাম আবদুর রশিদ সিটি করপোরেশন বালক উচ্চ বিদ্যালয়, পাঠানটুলী সিটি করপোরেশন বালক উচ্চ বিদ্যালয়, ফিরোজশাহ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পতেঙ্গা সিটি করপোরেশন মহিলা কলেজ ।
প্রতিটি কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রধান শিক্ষক ও ওয়ার্ড সচিবদের মোবাইল নম্বরও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও চসিক পরিচালিত যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রধানদের।
মেয়র বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বারবার মাইকিংয়ের মাধ্যমে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে আসার অনুরোধ জানানো হচ্ছে, বোঝানো হচ্ছে, প্রয়োজনে চাপও প্রয়োগ করা হচ্ছে। কেউ স্বেচ্ছায় সরে যেতে অনীহা প্রকাশ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট এনফোর্সমেন্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মেয়র শাহাদাত। তবে তিনি চান সবাই স্বেচ্ছায়ই নিরাপদ স্থানে সরে আসুন।
নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু, খাদ্য সহায়তা অব্যাহত
দুর্যোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য চসিকের দামপাড়ার বিদ্যুৎ অফিসে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোলরুম) খোলা হয়েছে। ০২৩৩৩৩৮৯১২২ ফোন নম্বরে এই কক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
মেয়র বলছেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পাশাপাশি জলাবদ্ধ এলাকাগুলোতেও জরুরি খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে চসিক। বিশেষ করে ৪, ৫ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পানিবন্দি এলাকায় রান্না করা খাবার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠানো হচ্ছে।
খাবারের কোনো সংকট নেই বলেও জানান মেয়র। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে এসে নিজেদের ও পরিবারের জীবন রক্ষা করবেন।




