৯৫ বছর আগে যেভাবে ৪ দিন স্বাধীন ছিল চট্টগ্রাম

পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, চট্টগ্রাম। ছবি : আগামীর সময়
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনাটি ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল ইংরেজদের। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল রাতের সেই অস্ত্রাগার দখলের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামকে চারদিনের জন্য স্বাধীন রেখেছিলেন বিপ্লবীরা। অস্ত্রাগার লুণ্ঠন দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও পরবর্তীতে লুট শব্দটি নিয়ে আপত্তি তোলে ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন। এখন এটি চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবস হিসেবেই স্বীকৃত। আজ সেই ঐতিহাসিক দিন।
এমন এক বীরত্বগাঁথা ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে ৯৫ বছর আগে দামপাড়া পুলিশ লাইনে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নানা বই এবং স্মৃতিকথায় বাঙালির গৌরবের সঙ্গে উঠে এসেছে এই ঘটনা। দামপাড়ার উঁচু পাহাড়ের ওপর গাছপালা ঘেরা ছোট লাল দালানটি এই অস্ত্রাগার। ইটের পুরো দেয়ালের একতলা চারকোণা ঘরটি এখনো তেমনি রয়েছে।
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার পর ২০২১ সালে লাল কুঠিরটির রঙ এবং আদল ঠিক রেখে জাদুঘর করার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। লাল ভবনটির সামনে সূর্য সেন ও প্রীতিলতার ছবি দিয়ে অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সারসংক্ষেপ সংবলিত একটি নামফলকও তোলা হয়েছিল তখন। জাদুঘরের অংশ হিসেবে সেখানে রাখা হয় বিপ্লবীদের ছবি ও ব্যবহার্য কিছু সামগ্রী। সেই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দামপাড়া পুলিশ লাইনে পাক বাহিনীর কাছে প্রাণ হারানো পুলিশ সদস্যদের স্মারকও রাখা হয় জাদুঘরটিতে। অর্থ্যাৎ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১ এর মুক্তিসংগ্রামকে একীভূত করা হয়েছিল সেখানে। ২০২২ সালের ২৬ মার্চ উদ্বোধন করা হয়েছিল এ জাদুঘর। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, চট্টগ্রাম’। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বন্ধ হয়ে গেছে জাদুঘরটি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সঠিক তথ্য নেই তার কাছে। তবে জাদুঘরটিতে যে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের স্মৃতিচিহ্ন এবং পুলিশের আত্মদানের স্মারক রয়েছে সেটা তিনি অবগত। পরে সিএমপির জনসংযোগ শাখার সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেছেন, ‘২০২৪ সালে আক্রান্ত হয়েছিল জাদুঘরটি। এখন পুনঃনির্মাণ কাজ চলছে সেখানে। তাই আপাতত বন্ধ।’
১৮ এপ্রিল ১৯৩০, কী ঘটেছিল সেদিন?
১৯৩০ সালের কথা। ইংরেজ পুলিশের রিজার্ভ ফোর্সের ব্যারাক ছিল দামপাড়ায়। ঘরটি ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। রাখা হতো অস্ত্র। দুদিকে লোহার রডের বেষ্টনীযুক্ত কাঠের কারুকাজ করা দুটি জানালা। ২০ ইঞ্চি পুরু দেয়াল, ছয়টি ইটের পিলারের ওপর দাঁড়ানো এ ভবন। ১৪০ বর্গফুটের ঘরটির উচ্চতা ১৪ ফুট। ছাদ ভেতরে বাঁকানো গম্বুজ আকৃতির।
বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’, কিংবা বিপ্লবী অনন্ত সিংহের ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’ বইয়ে রয়েছে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বিশদ বর্ণনা। একই দিন চট্টগ্রাম টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিসেও আক্রমণ করেছিলেন বিপ্লবীরা। ঐতিহাসিক যুদ্ধের দিনটির স্মৃতিচারণামূলক লেখায় দামপাড়া এলাকাটির পরিচয় মেলে। ব্রিটিশ আমলে জঙ্গলে ঘেরা ছিল দামপাড়া এলাকা। পুলিশ লাইনের বর্তমান পাহাড়টি তখন ছিল সড়ক থেকে অনেক উঁচুতে।
পূর্ণেন্দু দস্তিদার ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ বইতে লিখেছেন, ‘ইংরেজ রিজার্ভ ফোর্সের সদস্যরা এ দেশের সন্তান। তাই বিপ্লবীদের সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন সিদ্ধান্ত নিলেন, অস্ত্র নিয়ে লড়াই করার আগে রিজার্ভ ফোর্সের সদস্যদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করতে হবে। রাতের অন্ধকারে বিপ্লবীরা পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে উঠতে ধ্বনি দিতে থাকেন, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক) আর গান্ধীরাজ হো গিয়া, ভাগো (গান্ধীর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে, পালাও) স্লোগানের পাশাপাশি আকাশের দিকে ফাঁকা গুলিও চলল। আর তাতে বিভ্রান্ত হয়ে পালালেন বেশির ভাগ রিজার্ভ ফোর্স সদস্য।’
বইটিতে আরো উল্লেখ রয়েছে, ‘ওপরে ওঠার পর প্রহরারত সান্ত্রি ও হাবিলদার প্রথমে সামরিক পোশাকে সজ্জিত বিপ্লবী গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংকে দেখতে পেয়ে নিজেদের কোনো কর্মকর্তা মনে করে সালাম দেয়। রাইফেলধারী সান্ত্রি দুই বিপ্লবী নেতার গুলিতে যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখন আর কোনো লড়াইয়ের দরকার হয়নি। রাইফেল, গুলি ও অস্ত্রাগার ফেলে ইংরেজ সরকারের বেতনভুক্ত এই সব দরিদ্র দেশবাসী ব্যারাক ত্যাগ করে পালিয়ে যান।’
পরে দামপাড়ার এ লাল কুঠিতে স্থাপন করা হয়েছিল সর্বাধিনায়ক সূর্য সেনের প্রধান দপ্তর। গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহসহ বিপ্লবীরা রাইফেল দিয়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিতেন সেখানে। আনন্দ প্রসাদ গুপ্তের ‘চট্টগ্রাম বিদ্রোহের কাহিনী-বিপ্লবীদের কথা’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে- ‘পুলিশ লাইনের চারিদিকে আমাদের নিজস্ব পাহারা বসানো হল। ভারতীয় রিপাবলিকান ফৌজের বিজয় কেন্দ্রে পরিণত হল ইংরেজের সেই পুলিশ লাইন। ভারতের বুকে প্রথম স্বাধীন অস্থায়ী গভর্নমেন্ট স্থাপনের ঐতিহাসিক ঘটনা অনুষ্ঠিত হল সেই ঐতিহাসিক স্থানে। চট্টগ্রামে বিপ্লবী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনকে সেই অস্থায়ী গভর্নমেন্টের প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা করা হল।’
এতে আরও লেখা হয়, ‘যে পুলিশ লাইন দখল করা সব চাইতে কঠিন কাজ বলে মনে হয়েছিল তা আশাতীতরূপে সহজসাধ্য হয়ে গেল। ব্যারাকের এতগুলো পুলিশের ভিতর কারুর কাছ থেকেই কোনো বাধা এলো না। তারা যে যেদিকে পারল পালিয়ে বাঁচল। কিছুক্ষণ পরে দুজন পলাতক পুলিশ ফিরে আসছিল লাইনের দিকে, বোধ হয় কি অবস্থায় আমরা আছি তা পরীক্ষা করে দেখার উদ্দেশ্য। তাদের দুজনকেই আমাদের রক্ষীরা দেখতে পেয়ে গ্রেপ্তার করে হাতে হাতকড়ি লাগিয়ে (পুলিশ লাইনের গুদাম থেকেই এসব হাতকড়া আমরা পেয়েছিলাম) পুলিশ লাইনের একটি কক্ষে বন্দী করে রাখল।’
দামপাড়া অস্ত্রাগার দখলের পর পুনরায় ফেরার চেষ্টা করছিল বিতাড়িত ইংরেজ বাহিনী। আনন্দ প্রসাদ গুপ্ত ‘চট্টগ্রাম বিদ্রোহের কাহিনী—বিপ্লবীদেও কথা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘১৯ শে এপ্রিল ভোর হবার আগেই বিদ্রোহী বাহিনী পুলিশ লাইন অঞ্চল পরিত্যাগ করে পাহাড় জঙ্গলের ভিতর ঢুকে পড়ল। সারা দিন ধরে উঁচু নীচু জংলা পথ অতিক্রম করে অবশেষে শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে এক নিভৃত স্থানে গিয়ে সবাই উপস্থিত হল। সঙ্গে কোনো রসদ নেই— ২০ শে এপ্রিল এক রকম অনাহারেই কাটল সবার। ... একটা সময় বিপ্লবীরা আশ্রয় নিলেন জালালাবাদ পাহাড়ে। সেখানে ২২ এপ্রিল বিকেল পাঁচটায় প্রথম আক্রমণ চালায় ব্রিটিশ বাহিনী। তারা সোজাসুজি জালালাবাদ পাহাড়ে ওঠার ব্যর্থ প্রচেষ্টা না করে আরও দূরে সরে গিয়ে জালালাবাদেরই মত উঁচু দুটো পাহাড় বেছে নিয়ে তারা নতুন করে তাদের শক্তি সমাবেশ করল সেই পাহাড় দুটোর ওপর। সেখানে মেশিনগান খাটিয়ে এবার তারা প্রবল গুলিবর্ষণ করে জালালাবাদের পাহাড়চূড়া ক্ষত বিক্ষত করে তুলল। দেখতে দেখতে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের দশজন শত্রুর গুলিতে নিহত হল।’
সেই সংঘর্ষে পরাজিত হয়ে বিপ্লবীরা পিছু হটল। এভাবে ব্রিটিশ বাহিনী পুনরায় চট্টগ্রাম শহরে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করে।
স্মৃতি জাদুঘরে যা ছিল
লাল ভবনের জাদুঘরে ছিল মাস্টারদা, প্রীতিলতাসহ সব বিপ্লবীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও ছবি। যথাসম্ভব রাখা হয়েছিল তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন। প্রীতিলতার ব্যবহৃত অস্ত্রের একটি রেপ্লিকাও রাখা হয় সেখানে। ব্রিটিশ বিপ্লবের চার দশক পর এ লাল কুঠিকে সাক্ষী রেখে ১৯৭১ সালে আরেক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছিলেন বীর পুলিশ সদস্যরা। স্বাধীনতা ঘোষণার দুদিন পর ২৮ মার্চ ভোরে দামপাড়া পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছিল পাকিস্তান বাহিনী। পুলিশ সদস্যরা সেদিন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন সাধারণ অস্ত্র দিয়ে।
শহীদ হয়েছিলেন এসপি শামসুল হক, ওসি আবদুল খালেকসহ ৫১ জন পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া পুলিশ সুপারের বাসভবনসহ বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে মোট ৮২ পুলিশ সদস্য শহীদ হওয়ার তথ্য রয়েছে। জাদুঘরে রাখা ছিল সেই সংঘর্ষ এবং হতাহত সদস্যদের স্মৃতিচিহ্নও। দেয়ালে ছিল মুক্তিযুদ্ধে অবদানকারী পুলিশের ছবি স্মারক। ব্রিটিশ আমল থেকে পুলিশের পোশাকের নানা বিবর্তনও তুলে ধরা হয় এখানে।
ঐতিহাসিক স্মৃতি বহনকারী জাদুঘরটি পুনরায় চালু হবে বলে প্রত্যাশা বিপ্লবী তারেকশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিঞ্চন ভৌমিকের। তিনি জানিয়েছেন, বিপ্লবীদের বীরত্বগাথা জানাতে হবে নতুন প্রজন্মকে। এ কারণে জাদুঘরটি পুনরায় চালু করা দরকার।




