এ এক অভাগা শহর!

সংগৃহীত ছবি
স্বনামে খ্যাত এক সাংবাদিক-সম্পাদকের অফিস। ছোট্ট কক্ষ। বেশ পরিপাটি। ধূলোর সঙ্গে যেন প্রতিটি আসবাবের আজন্ম শত্রুতা। গ্রিল ছাড়া কাচে ঢাকা জানালায় চোখ গেলেই দেখা মেলে সুনির্মল আকাশ। ঢাকার আকাশ।
সম্পাদকের সামনে বসা বিভাগীয় শহরের একদল সংবাদকর্মী। সিগারেটর আগুনের তাপে ঈষৎ পোড়া ঠোঁটে স্মিত হাসি সম্পাদকের। জানতে চাইলেন, তোমাদের মধ্যে কে কে ঢাকা শহরে কাজ করতে চাও। সংবাদকর্মীরা নীরব। চোখের পাতা মেঝের টাইলসের শ্বেতরঙে আটকে গেছে যেন! নীরবতা অসম্মতির লক্ষণ বুঝতে পেরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন সম্পাদক। ‘চট্টগ্রামের মানুষকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলে ঢাকায় থাকতে চায় না। কাজ শেষে ফিরে যায় তাদের আপন শহরে। সিলেটেরও একই সুর। আমাদের এ এক অভাগা শহর। ঢাকা।’
দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে রাজধানী ঢাকার আয়তন প্রায় ৩০৫ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী ঢাকায় দেড় কোটির কাছাকাছি মানুষের বসবাস। তবে সাধারণ কর্মদিবসে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ উপকণ্ঠ থেকে লাখো মানুষ এই শহরে প্রবেশ করে। সব মিলিয়ে প্রতিদিনের কমপক্ষে দুই কোটি মানুষের শহর ঢাকা।
নানা পথ ঘুরে পাওয়া তথ্য বলছে, ঢাকার মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশ মানুষ এই শহরের আদি বাসিন্দা। যাদের ঢাকাইয়া বলা হয়। এ ছাড়া মূল জনসংখ্যার বড় অংশই দেশের অন্যান্য জেলা থেকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা উন্নত জীবনযাত্রার তাগিদে এসে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
আজ বুধবার সকালের কারওয়ান বাজার। ফুটপাতে যেন জনস্রোত। গাড়ির ফাঁক গলে ইঞ্চিখানেক রাজপথ দেখা কঠিন। ঠেলাগাড়ি, ভ্যানে বোঝাই নিয়ে পেটের জন্য সংগ্রামে রত হাজারো মানুষ। ঘাম ঝরছে। শরীর হয়ে গেছে তামাটে।
বড় বড় মানুষদের আবাস গুলশানের চিত্র আবার ভিন্ন। পরিপাটি পোশাকে ছুটছেন হাজারো করপোরেট কর্মী। ফুটপাতের এক কোণায় চা-সিগারেট নিয়ে বসা দোকানির সামনে এসে থামছেন কেউ কেউ। গলিপথ মাড়িয়ে কোটি টাকার গাড়িতে সাঁই সাঁই করে গন্তব্যে ছুটছেন ভদ্রপল্লীর মানব, অতিমানবেরা।
পেটের দায়ে ঢাকায় থিতু হওয়া এক করপোরেট কর্মীর ভাষ্য, ‘এত মানুষের ভার আসলেই বইতে পারছে না ঢাকা। এজন্য এখানে মানুষ হাঁসফাঁস করে। লম্বা ছুটি পেলে ঢাকা ছেড়ে মানুষের নিঃশ্বাস ফেলার গল্প তো আমরা পত্রিকাতেই পড়ি। এটাই বাস্তবতা কিন্তু।’
তবুও গাবতলী কিংবা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে নেমে আসা জোড়া জোড়া বুনোচেখের কাছে স্বপ্নের শহর ঢাকা। কোলাহল, সংগ্রাম আর অনুভূতির এক মহাকাব্য। যে শহর ঘুমায় না। রিকশার টুংটাং শব্দ, ফুটপাতে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপ, আর মাথার ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলা মেট্রোরেল—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অচেনা সুর।
৪০০ বছরের পুরনো ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়িগঙ্গা তীরের এই তিলোত্তমা ঢাকা একদিকে কংক্রিটের জঙ্গল। অন্যদিকে কোটি মানুষের স্বপ্ন বোনার উর্বর এক কারিগর।
যদিও ধূলোঝড়ে মলিন। তারপরও ঢাকাকে বুঝতে হলে চিনতে হবে পুরান ঢাকার সংকীর্ণ গলি। লালবাগ কেল্লার লাল ইট। যেখানে ইতিহাস কথা বলে। আহসান মঞ্জিল বা কার্জন হল মনে করিয়ে দেয় এর আভিজাত্যময় অতীত।
মধ্যরাতেও কারওয়ানবাজারে শাকসবজির বিকিকিনি কিংবা ভোরে টিএসসিতে তরুণ-তরুণীদের আড্ডা—সবমিলিয়ে ঢাকা এক জীবন্ত ক্যানভাসও।
ইতিহাসের লাল ঘর থেকে বেরোলেই গুলশান, বনানী বা উত্তরার কাচঘেরা বহুতল ভবনগুলো জানান দেয় এক আধুনিক বাংলাদেশের গল্প। আকাশ ছোঁয়া ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে আর মেট্রোরেল গতি এনেছে নগরজীবনে। তবুও নিত্য যানজট আর জনজট থামাতে উদ্যত হয় সেই গতি। বায়ুদূষণ আর বৃষ্টির দিনে জলজট।
ভোগান্তি তাদের নিত্যসঙ্গী। ঢাকা তাদের যন্ত্রণা দেয়, কষ্ট দেয় বড় বেশি। হাঁপিয়ে তোলে। তবু ঢাকাই কিন্তু তাদের বেঁচে থাকার পথ ঠিকই দেখিয়ে দেয়।
ঢাকা জানে, এই মানুষগুলোই দিনশেষে তার প্রাণশক্তি। কিন্তু ঢাকার এই নিঃশব্দ অনুভূতির খবর কী পৌঁছে তার বুকে বসত গড়া মানুষগুলোর কাছে ?




