খাতুনগঞ্জের নারকেলের বাজার ভারতের দখলে

সংগৃহীত ছবি
দেশের ভোগ্যপণ্যের প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। সাধারণত পেঁয়াজ, রসুন, মসলা, বিভিন্ন ধরনের ডাল আর ভোজ্য তেল, চিনি, গম, গুঁড়া দুধের জন্য এই বাজার পরিচিত হলেও সম্প্রতি এখানে নতুন এক রাজত্ব তৈরি হয়েছে ভারতীয় নারকেলের। ভোলার মনপুরা, লক্ষ্মীপুর জেলা কিংবা পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আসা নারকেলে মুখর থাকত এই পাইকারি বাজার। এখন চিত্র ভিন্ন। সারি সারি ট্রাক থেকে এখন নামছে ভারতের তামিলনাড়ু থেকে আসা নারকেল। আকারে বড় আর পচনশীলতা কম হওয়ায় খাতুনগঞ্জের বাজার এখন প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি করা নারকেলের দখলে।
পোল্লাচি থেকে খাতুনগঞ্জ : দীর্ঘ যাত্রা
খাতুনগঞ্জের আড়তদাররা জানালেন, এই নারকেলের প্রধান উৎস ভারতের দক্ষিণ রাজ্য তামিলনাড়ু। সেখানকার পোল্লাচি। বিশ্ব জুড়ে এই অঞ্চল থেকে নারকেল রপ্তানি হয়। পোল্লাচির নারকেল ওজনে ভারী এবং শাঁস হয় অনেক পুরু।
এই নারকেল আমদানিতে মূলত দুটি পথ ব্যবহার করা হয়। বড় আমদানিকারকরা জাহাজের কনটেইনারে করে সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসেন। ছোট আমদানিকারকরা আনেন সাতক্ষীরার ভোমরা ও যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ট্রাকে। সেখান থেকে ট্রাকে করে প্রতিদিন খাতুনগঞ্জের আড়তগুলোয় নামানো হয়। প্রক্রিয়াজাত বলে দীর্ঘ পথে নারকেল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
খাতুনগঞ্জের বাজারে কেন ভারতীয় নারকেল এত জনপ্রিয়, এমন প্রশ্নে আসাদগঞ্জের আড়তদার ইব্রাহিম বলেছেন, এর পেছনে বেশ কিছু যান্ত্রিক ও বাণিজ্যিক কারণ রয়েছে। সাধারণত এগুলোকে বলা হয়, সেমি-হাস্কড কোকোনাট। অর্থাৎ, নারকেলের ওপরের শক্ত খোসা আংশিক ছাড়ানো থাকে, যা পরিবহনের জন্য সুবিধা।
একটি ভারতীয় নারকেল ওজনে ৫০০-৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। দ্বিতীয়ত অনেক দিন রাখা যায়। দেশি নারকেল কয়েক সপ্তাহ রাখলেই পানি শুকিয়ে যায় বা পচন ধরে। কিন্তু ভারতীয় নারকেল বিশেষ প্রক্রিয়ায় পরিষ্কার করা থাকে বলে গুদামে দুই-তিন মাস পর্যন্ত অনায়াসেই রাখা যায়। পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, ভারত থেকে আসা লটে নষ্ট নারকেলের হার ১ শতাংশেরও কম, যা দেশি জাতের ক্ষেত্রে ১০-১৫ শতাংশ।
নারকেলের চাহিদা সারা বছর থাকলেও খাতুনগঞ্জে এখন এর ‘পিক সিজন’ বা ভরা মৌসুম চলছে। বিশেষ করে শবে বরাত ও রমজান মাসকে কেন্দ্র করে এর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এরপরই আসে শীতকাল। পিঠা-পুলির উৎসবে গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের প্রতিটি ঘরে নারকেলের প্রয়োজন পড়ে।
আড়তদাররা জানালেন, বর্তমানে দেশি নারকেলের সরবরাহ এতটাই অনিয়মিত যে ভারতের সরবরাহ না থাকলে বাজারে হাহাকার পড়ে যেত। বিশেষ করে গরমকালে ডাবের বিকল্প এবং রান্নার উপকরণ হিসেবে এর চাহিদা থাকে প্রচুর।
নারকেল মূলত তিনটি বড় খাতে সরবরাহ করা হয়। খাদ্যশিল্প, দেশের বড় বড় বেকারি ও বিস্কুট কোম্পানিগুলো ভারতীয় নারকেলের প্রধান ক্রেতা। এ ছাড়া মিষ্টির দোকানগুলোয় ছানা ও হালুয়া তৈরিতে নারকেল ব্যবহৃত হয়।
অভিজাত হোটেলগুলোয় মালাইকারি বা বিভিন্ন গ্রেভি তৈরিতে এবং বিয়েবাড়ির রান্নায় একচেটিয়াভাবে বড় আকারের ভারতীয় নারকেল ব্যবহার করা হয়। কসমেটিকস ও দেশীয় নারকেল তেল প্রস্তুতকারক ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তারাও এখন আমদানি করা নারকেলের ওপর নির্ভরশীল।
একসময় পটুয়াখালী, ভোলা, লক্ষ্মীপুর ও বাগেরহাটের নারকেল ছিল খাতুনগঞ্জের প্রাণ। কিন্তু বর্তমানে সেই জায়গা দখল করেছে বিদেশি প্রাকৃতিক পণ্য। এর প্রধান কারণ ফলন বিপর্যয়। উপকূলীয় অঞ্চলে নারকেলগাছে হোয়াইট ফ্লাই বা সাদা মাছি ও মিলিব্যাগ পোকার আক্রমণে ফলন ব্যাপক হারে কমেছে। এ ছাড়া নারকেলগাছের সংখ্যা কমে আসা এবং নতুন করে বাগান করার অনীহাও বড় কারণ।
আরেকজন ব্যবসায়ী আফসার উদ্দিন বলছেন, একটি দেশি নারকেল পাড়া থেকে শুরু করে বাজারে আনা পর্যন্ত যে খরচ, তার চেয়ে আমদানি করা নারকেলের দাম অনেক সময় কম পড়ে। বাজারে বর্তমানে একটি বড় ভারতীয় নারকেল পাইকারিতে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে সমমানের দেশি নারকেল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দেশি নারকেল হলে এর দাম থাকে প্রায় ৮০-৯০ টাকা।
খাতুনগঞ্জের এক প্রবীণ ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘আগে আমরা দেশি নারকেলের অপেক্ষায় থাকতাম। এখন দেশি নারকেল আসে ছোট ট্রাকে করে অল্প পরিমাণে, আর ভারতীয় নারকেল আসে কনটেইনার ভরে।’




