১০ কনটেইনার পাকিস্তানি তামাকে ‘সাবস্ট্যান্স’ দেখছেন গোয়েন্দারা

ছবি: আগামীর সময়
পাকিস্তান থেকে আনা দেড় শ টন কাঁচা তামাকে ‘সাবস্ট্যান্স’ বা নিষিদ্ধ রাসায়নিক দেখছে কাস্টমস গোয়েন্দারা। তাদের ধারণা এই কাঁচা তামাক পাতার আড়ালে এমন কিছু মেশানো আছে, যা সাধারণ চোখে দেখা যাচ্ছে না। নিশ্চিত হতে ১০ কনটেইনার থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষার জন্য দেশের একাধিক ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে।
চট্টগ্রামে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অফিসে সংবাদ সম্মেলনে এই সন্দেহের কথা জানান প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক রেজভী আহমেদ। তার যুক্তি, ‘সাধারণ ‘টেবিল টেস্টে’ এই তামাক পাতায় সহজে আগুন ধরছিল না। তাই এর ভেতরে অন্য কোনো ক্ষতিকর ‘সাবস্ট্যান্স’ বা রাসায়নিক পদার্থ মেশানো আছে কি না, তা সন্দেহ করা হচ্ছে। খালি চোখে এটি ধরা সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি কনটেইনার থেকে পর্যাপ্ত নমুনা সংগ্রহ করে বিসিএসআইআর, পরমাণু শক্তি কমিশন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ল্যাব রিপোর্ট ও তদন্তে অবৈধ কিছু প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি আইনে মামলা করা হবে।’
চট্টগ্রাম বন্দরে বন্ড সুবিধায় ১০ কনটেইনার কাঁচা তামাক এনেছে কুষ্টিয়ার প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড’। চালানটি এসেছে পাকিস্তান থেকে। এই প্রতিষ্ঠানের কুষ্টিয়া কারখানায় অভিযান চালাতে গিয়েই বিভিন্ন ধরনের ব্যাপক অনিয়ম, শুল্ক ফাঁকির বিষয় উদঘাটিত হয়। এরই মধ্যে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানির বন্ড লাইসেন্স স্থগিত করে রাজস্ব বোর্ড। এরপরই ১০ কনটেইনার বন্দরে আটকে দেয় কাস্টমস গোয়েন্দা দল।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা সদর দপ্তর জানতে পারে, চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ১০টি কনটেইনারে থাকা তামাকের প্রকৃত অবস্থা সন্দেহজনক। এরপরই চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয় তৎপর হয়। চালানটি দুবাইয়ের ‘টেট্রা ট্রেড এফজেডসিও’-এর পক্ষে পাকিস্তানের ‘আলি লিফ ট্রেডার্স’ থেকে আমদানি করা হয়েছিল। এর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ছিল চট্টগ্রামের ‘ইসলাম অ্যান্ড সন্স’। গত ১৯ অক্টোবর চালানটি বন্দরে পৌঁছায়। ২০ অক্টোবর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিল অব এন্ট্রি জমা দিলেও কাস্টমস প্রক্রিয়া শুরুর আগেই গোয়েন্দারা এটি আটকে দেয়।
গোয়েন্দা দলের প্রাথমিক তদন্তে গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানির একাধিক গুরুতর অনিয়ম বেরিয়ে আসে। যশোরের কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট গত ২৮ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযানে বন্ড সুবিধার চরম অপব্যবহারের প্রমাণ মেলে।
কারখানার রেজিস্টারের হিসাবের চেয়ে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৩৬৯ কেজি কাঁচা তামাক গুদামে কম পাওয়া যায়। অর্থাৎ এগুলো অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে, ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৬৭২ কেজি আধা-প্রক্রিয়াজাত তামাক (লেমিনা) অতিরিক্ত পাওয়া যায়। এই অতিরিক্ত তামাক কোথা থেকে এলো, তার কোনো বৈধ কাগজপত্র প্রতিষ্ঠানটি দেখাতে পারেনি।
গ্লোবাল লিফ ট্যোবাকো কম্পানি লিমিটেডের বিপণন কর্মকর্তা মোহিনুল ইসলাম জানালেন, আপনার কাছ থেকেই এই ধরনের তথ্য আমি প্রথম শুনলাম। আমার কোম্পানির একটা রেপুটেশন আছে।
পরে কাস্টমস গোয়েন্দা দলের প্রেস কনফারেন্সে বিষয়টি জানিয়ে মন্তব্য চাইলে তিনি সুর নরম করেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেই ঊর্ধ্বতনের কন্টাক্ট নম্বর দিতে অপারগতার কথা জানান।
ভ্যাট কর্মকর্তারা মনে করছে, প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধা পেয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। এর আগে তারা স্থানীয়ভাবেই পণ্য বাজারজাত করত। ফলে বিপুল পণ্য বন্ড সুবিধায় এনে খোলাবাজারে বিক্রি করছিল। এই প্রথম ধরা পড়ল। গুদাম থেকে সরিয়ে ফেলা তামাকের বিপরীতে প্রতি কেজিতে ৫০ টাকা হারে ১ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার ৪৫০ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে কারখানার ভেতরেই ৩ কোটি ২৯ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি ধরা পড়ে।
পণ্য আমদানিতেও মূল্য অস্বাভাবিক কম ঘোষণা দেয় গ্লোবাল লিফ। কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে ভারত থেকে আগে আমদানি করা একই তামাকের প্রতি কেজির মূল্য ছিল ৫.১০ ডলার। কিন্তু এই চালানে প্রতি কেজির মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে মাত্র ১.৪৫ ডলার। আমদানীকৃত ১০ কনটেইনারে মূল্য কম দেখিয়ে (আন্ডার ইনভয়েসিং) প্রায় ২১ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিপুল টাকা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচারের সন্দেহও গোয়েন্দা দলের।
গোয়েন্দা প্রধান রেজভী আহমেদ হিসাব কষে দেখালেন, কনটেইনারে আনা ১৫০ টন তামাক দিয়ে প্রায় ৪৯৪ কোটি টাকা মূল্যের ২১ কোটি ৪৩ লাখ শলাকা প্রিমিয়াম সিগারেট তৈরি সম্ভব হতো। এটি অবৈধভাবে বাজারে গেলে সরকারের প্রায় ৪৯৪ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হতো। দেশের বৈধ সিগারেট ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তেন।
এসব গুরুতর অনিয়ম ও শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রথমত, চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে থাকা ১০ কনটেইনার তামাকের খালাস সম্পূর্ণ স্থগিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো কোম্পানির বন্ড লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিস (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি বিচারাধীন। আইনি প্রক্রিয়া ও শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই চালান ছাড়করণের কোনো সুযোগ নেই। পাশাপাশি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের অতীত কার্যক্রমও খতিয়ে দেখার কথা জানান কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।



